রায়পুরায় একের পর এক নিখোঁজ, জনমনে বাড়ছে শঙ্কা

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় একের পর এক ব্যক্তি নিখোঁজের ঘটনা এবং পরবর্তীতে তাদের নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার পর কেন তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না, সেই প্রশ্নে স্থানীয়দের মাঝে নানা সন্দেহ ও দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বয়সী পাঁচজনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রয়াণের ঘটনায় পুরো এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ঘটনায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের লক্ষ্যে চালকদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওসি আরও বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই অটোরিকশাচালক। পাশাপাশি তার সঙ্গে চলাফেরা করা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্নভাবে খোঁজ চালানো হয়। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজের পরপরই থানায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত মিলছে লাশ। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাই এই প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ যেন অপরাধীদের শনাক্ত করে কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং নিখোঁজদের সন্ধানে তৎপরতা আরও জোরদার করে।

সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর রায়পুরার শ্রীনগর ইউনিয়নের ভেলুয়ারচর এলাকায় একটি খালের পাশে ঝোপঝাড় ও কচুরিপানার ভেতর থেকে ১২ বছর বয়সী তারেক নামের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মালয়েশিয়াপ্রবাসী জিয়াউর রহমানের সন্তান তারেক গত ১৫ অক্টোবর নিজের সাইকেল নিয়ে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল। এই ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে।

এর ঠিক এক দিন আগে, ১৮ অক্টোবর সকালে উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদ এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে আরমান ফকির নামের ২৪ বছর বয়সী এক যুবকের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ভাটিবদরপুর এলাকার সালাহউদ্দিন ফকিরের ছেলে। স্বজনদের মতে, গত ১১ অক্টোবর বাড়িতে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার পর থেকে আরমান নিখোঁজ ছিলেন।

গত ১৩ অক্টোবর একই উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে রহমত উল্লাহ (১৮) নামের এক কিশোরের দেহ পাওয়া যায়। চর মরজাল গ্রামের জামাল মিয়ার ছেলে রহমত ছিলেন বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবারের দাবি, নদীতে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে ৫ অক্টোবর আদিয়াবাদ ইউনিয়নের বড়বিল এলাকায় কচুরিপানার ভেতর থেকে মনির হোসেন (১৭) নামে ব্যাটারিচালিত এক অটোরিকশাচালকের লাশ মেলে। চরসুবুদ্ধি ইউনিয়নের শাহ আলম মিয়ার ছেলে মনির গত ২৪ সেপ্টেম্বর অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়ে আর ফেরেননি। এই ঘটনায় পরিবারের করা মামলার তদন্তে পিবিআই নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাগপাড়া ও কুমিল্লার লালমাই থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মনিরের অটোরিকশার চারটি ব্যাটারিও উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে যে, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।

পাশাপাশি, গত ২৯ জুন রায়পুরার পাড়াতলী ইউনিয়নের মধ্যনগর এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় সাত বছর বয়সী শিশু তাসকিয়া। চার দিন পর বাড়ির পাশের একটি জমি থেকেই তার অর্ধগলিত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও তৎপরতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, নিখোঁজের জিডি পাওয়া মাত্রই পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয়। অটোরিকশাচালকদের প্রলুব্ধ করে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ছিনতাই ও অপরাধ সংগঠনের তথ্য সামনে আসায় তিনি চালক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকতর সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে, রায়পুরা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি রোধে পুলিশি নজরদারি ও প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। তিনি স্থানীয়দের সচেতন থাকা, সন্দেহজনক বিষয় পুলিশকে জানানো এবং যেকোনো গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান। জনমনে নিরাপত্তার আস্থা ফিরিয়ে আনতে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *