ইলহান ওমরের বাড়িতে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা: রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বাড়িতে আকস্মিক তল্লাশি চালিয়েছেন কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। সোমবার ওয়াশিংটন ডিসির অদূরে অবস্থিত তার বাড়িতে এই অভিযানের ঘটনা ঘটে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে এই তল্লাশি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা আরও বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের ৩০ দিনেরও কম সময় আগে তাঁর ও তাঁর পরিবারের বাড়িতে হানা দিয়েছে ট্রাম্পের নির্বিচার গণ-নির্বাসন অভিযান পরিচালনাকারী যন্ত্র। ওমরের ভাষায়, তাঁকে নিয়ে ট্রাম্পের অতিরিক্ত আগ্রহ ‘অস্বস্তিকর’।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ভোরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের কর্মকর্তারা ওমরের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেন। তবে ফক্স নিউজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তল্লাশি সম্ভবত ওমরের ছোটবেলায় সোমালিয়া থেকে আসার সময় তার বাবার করা অভিবাসনসংক্রান্ত নথিগুলোতে জালিয়াতির অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ইলহান ওমর শিশু শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্ব পান। মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ওমর বরাবরই অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই তল্লাশির নিন্দা জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি একে গত দশ বছর ধরে চলা ভিত্তিহীন মিথ্যা প্রচারণা ও ভয় দেখানোরই একটি অংশ বলে উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তল্লাশির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ওমরের নাম প্রকাশ করেনি। তারা কেবল জানিয়েছে, আদালতের যথাযথ পরোয়ানা মেনেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে ওমরের দপ্তর এই অভিযানকে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার বলে বর্ণনা করেছে। কংগ্রেস সদস্য কোনো অন্যায় করেননি দাবি করে তার দপ্তর জানায়, কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে সরকারের কেন্দ্রীয় শক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়।

ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতারাও এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। হাউস ডেমোক্র্যাটিক লিডার হাকিম জেফ্রিস, হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক এবং দলীয় ককাস চেয়ারম্যান পিট আগুইলার এক যৌথ বিবৃতিতে এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেন, ট্রাম্প ও উগ্র ডানপন্থীরা বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে ওমরকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন। এটি সাধারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধিকে লক্ষ্যবস্তু করারই অপপ্রয়াস। তিনি আরও লেখেন, ‘গত ১০ বছর ধরে ট্রাম্প ভিত্তিহীন মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে আমাকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।

উল্লেখ্য যে, তল্লাশির কয়েক দিন আগেই টেনেসির এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প ওমরকে সোমালিয়ার মতো ‘অপরাধ ও নোংরামিতে ভরা’ দেশ থেকে আসা ব্যক্তি হিসেবে কটাক্ষ করেছিলেন। ট্রাম্পের দাবি, এই তদন্তের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না এবং বিষয়টি সম্পূর্ণ বিচার বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। তবে এর আগে ট্রাম্পের সহযোগী জে ডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে ওমরের বিরুদ্ধে অভিবাসন জালিয়াতির ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছিলেন এবং কীভাবে ওমরকে তদন্তের আওতায় আনা যায় তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলেছিলেন। ভ্যান্সের সেই অভিযোগকে ওমর আগেই মনগড়া ও মানহানিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং তাঁর প্রশাসনের লোকজন ওমরকে নিয়ে তদন্ত করছেন। রক্ষণশীল ধারার পডকাস্ট উপস্থাপক বেনি জনসনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ওমরকে কীভাবে তদন্ত করা যায়, তা নিয়ে তিনি ও হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার আলোচনা করেছেন। এভাবে একটি মামলা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আলোচনা করেন।

২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ইলহান ওমর ও তার পরিবার একাধিকবার মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। তিনি প্রগতিশীল আইনপ্রণেতাদের গোষ্ঠী ‘দ্য স্কোয়াড’-এর সদস্য, যারা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই তার আক্রমণের শিকার। এর আগে গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প তাকে ও অন্যান্য সোমালি অভিবাসীদের ‘আবর্জনা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এছাড়াও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের পর ওমর ও রাশিদা তালিবকে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

উল্লেখ্য, গত মাসেই মিনেসোটার এক ব্যক্তিকে ১৪ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত জানুয়ারিতে একটি টাউন হল সভায় ওমরের গায়ে ভিনেগার ছিটানোর দায়ে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। তৎকালীন পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত, কারণ ওমর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) বিলুপ্তির দাবি তুলেছিলেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয় ও কংগ্রেসের প্রথম এই মুসলিম-আফ্রিকান নারী সদস্যের মধ্যকার বিরোধ দীর্ঘদিনের এবং বর্তমান তল্লাশি তাকে ঘিরে চলমান উত্তেজনারই সর্বশেষ সংযোজন। নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়বে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানোর সেই প্রচারণায় এটি সর্বশেষ পদক্ষেপ।’।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *