ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: বেতন নেন বরাদ্দপ্রাপ্ত চালক
৪ অক্টোবর রাত প্রায় পৌনে একটা। সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি ময়লার গাড়ি। চালকের আসনে বসা সাজু আহমেদ নামে এক যুবকের কাছে মূল চালকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে দাবি করেন চালক আশপাশেই আছেন। কিন্তু পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তাঁর চাচা অর্থাৎ মূল চালক গোলাপবাগ মোড়ে আড্ডা দিচ্ছেন। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেছি, তবে মূল চালক আর আসেননি। কিছুক্ষণ পর তেল না নিয়েই গাড়িটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। ডিএসসিসির নথিতে ঢাকা-মেট্রো-শ-১১-৪২৪৭ নম্বরের এই গাড়িটি ভারী যান চালক সরদার হুমায়ন কবিরের নামে বরাদ্দ। তবে চালকের আসনে বসা সাজু করপোরেশনের কোনো কর্মচারী নন। তিনি মাসে ১০ হাজার টাকায় সহকারীর কাজ করেন। ভারী গাড়ি চালিয়ে পাম্পে এলেও তাঁর দাবি, তাঁর রয়েছে শুধু হালকা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স। রাত পৌনে একটার দিকে আসে ১১-৪৩০৩ নম্বরের গাড়িটি। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, চালকেরা দিন–রাত মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান। অন্তত ৩৫ জন চালক জড়ো হয়ে আমার কাছে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। খিলগাঁওয়ে ডিএসসিসির ময়লার গাড়িচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাম্পে কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, করপোরেশনের চালকদের কিছুটা কম দামে তেল বিক্রির বিষয়টি সবাই জানেন। ১২ মে দৈনিক বাংলা মোড়ে বাদশা মিয়া এবং ২৩ নভেম্বর বকশীবাজারে মোটরসাইকেল আরোহী নূরজাহান পুষণ নিহত হন। ২০ জানুয়ারি দয়াগঞ্জে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের কর্মী খালিদ, ১৬ এপ্রিল যাত্রাবাড়ীতে রিকশাচালক মোস্তফা এবং মে মাসে টিটিপাড়ায় ব্যাংক কর্মচারী স্বপন আহমেদ দিপু নিহত হন। আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হয়ে গাড়ি চালানোর সুযোগ পেয়েছিলেন বলে পুলিশের বক্তব্যে উঠে আসে।
প্রায় পাঁচ বছর আগে ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারিয়েছিলেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। সেই গাড়িটিও চালাচ্ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, যিনি কখনোই গাড়ি চালানোর অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন না। দক্ষিণ সিটির বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি নিয়ে নিজস্ব অনুসন্ধানে ২২টি গাড়ি বৈধ চালকদের বদলে অন্যদের দিয়ে চালানোর সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগ ও মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকৃতপক্ষে এমন অনিয়মে চালানো গাড়ির সংখ্যা অন্তত ৫৬টি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত চালকেরা নিজেরা আরামে থাকেন আর তাঁদের গাড়ি চালাচ্ছেন তাঁদের রাখা সহকারী বা বাইরের লোক। পরে স্কুলছাত্র মাহিন আহমেদ ও লন্ড্রির দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাতেও পাওয়া যায় একই অনিয়ম। ২০২১ সালে ছয়টি ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে রাস্তা পার হওয়ার সময় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে চাপা দেয় দক্ষিণ সিটির ময়লার গাড়ি। পরদিন পুলিশ জানায়, গাড়ি চালাচ্ছিলেন রাসেল খান।
বহিরাগত ও অনভিজ্ঞ চালকদের হাতে সিটি করপোরেশনের ভারী যানবাহন তুলে দেওয়ার এই অনৈতিক চর্চার কারণে সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে নির্মম দুর্ঘটনা। অনুসন্ধানে ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৫টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে বাসাবো এলাকায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হন আরও দুজন। সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৬টি দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে, যার পেছনে মূলত অসচেতনতা ও অবৈধ হাতবদল দায়ী। তবে লোক বাড়ানোর সঙ্গে বেতন দেওয়ার সামর্থ্যের বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ৪ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে অবস্থান করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটির নিজস্ব এই পাম্প থেকে পরিচ্ছন্নতা কাজের যানবাহনে প্রতিদিন তেল সরবরাহ করা হয়। পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, চালকের সহকারী সাজু আহমেদ তেল নিতে এলেও কোনো জ্বালানি না নিয়ে চলে যান। সাজু চলে যাওয়ার পর পাম্পের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কয়েকজন এগিয়ে এসে অনুসন্ধানের বিষয়টি জানতে চান। তাঁদের মধ্যে এক ব্যক্তি জানান, কেবল গাড়ি অন্যকে দেওয়া নয়, গাড়ি বরাদ্দের জ্বালানি পুরোপুরি না তুলে বাকি অংশের টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়ার মারাত্মক অভিযোগও রয়েছে এই চক্রটির বিরুদ্ধে।
ঘটনার পরদিন ৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশে করপোরেশনের গাড়ি রাখার অপর একটি গ্যারেজে সরেজমিনে যাওয়া হয়। পদ্মা সেতুর দিকে যাওয়া রেললাইনের কাছের এই গ্যারেজে ঢাকা-মেট্রো-শ-১১-৪৩১৪ ও ঢাকা-মেট্রো-শ-১১-৪৩১২ নম্বরের দুটি ময়লার গাড়ি পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে আগে থেকেই তথ্য ছিল, এই দুটি গাড়িও মূল চালকের বদলে অন্য লোক দিয়ে চালানো হয়। গ্যারেজে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানকালে দেখা যায় চালক নন, বরঞ্চ অনভিজ্ঞ লোকেরাই গাড়ি সামলাচ্ছেন। একপর্যায়ে সাংবাদিকের উপস্থিতির বিষয়টি টের পেয়ে সেখানে অবস্থানরত কর্মীরা তাড়াহুড়ো করে দুটি গাড়িই নিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। তবে ১১-৪২৭০ ও ১১-৪৩০৭ নম্বরের গাড়ি দুটি বের হচ্ছিল না। একপর্যায়ে করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় ফিরে আসি। বিভিন্ন বিভাগে জনবলের প্রয়োজন জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এর আগের রাতে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা-মেট্রো-শ-১১-৪২৭৮ নম্বরের আরেকটি গাড়ির মূল চালকেরও কোনো খোঁজ মেলেনি। ৪ অক্টোবর রাত ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় গাড়িটি সেখানে চালকহীন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এভাবে চালক না থাকা এবং সহকারীদের হাতে চাবি সোপর্দ করার বিষয়টি প্রতিনিয়ত নগরবাসীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে। স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, পাম্প ও গ্যারেজগুলোতে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় গভীর রাতে এসব অবৈধ চালকদের অবাধ বিচরণ বাড়ে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নগর ভবন ঘেরাও, তদন্ত ও চালক বরখাস্তের পরও অন্যের হাতে গাড়ির চাবি দেওয়া বন্ধ হয়নি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালককে না পাওয়ায় ওই রাতে তাঁর পরিচয় যাচাই করা যায়নি।
ডিএসসিসির সার্বিক চালক সংকট ও জনবল কাঠামোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সংস্থাটির মোট যান ও যন্ত্রপাতির (যেমন এক্সক্যাভেটর, রোড রোলার, বুলডোজার ইত্যাদি) সংখ্যা ৬০৮টি। তবে এর বিপরীতে স্থায়ী চালকের মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে মাত্র ২৫২টি। বর্জ্য পরিবহনের ভারী যানও এই হিসাবের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। স্থায়ী চালকের পদ ও গাড়ির পরিমাণের এই বিশাল ঘাটতির কারণে মাস্টাররোল কিংবা দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীদের দিয়ে বাধ্য হয়ে গাড়ি চালাতে হয়, যা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণহীন অনিয়মে রূপ নেয়। তাঁর বক্তব্য, কিছু গাড়িতে হাইড্রলিক ব্যবস্থা চালাতে ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়।
ডিএসসিসি এলাকার ৭৫টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি থেকে সংগৃহীত ময়লা প্রথমে নিয়ে আসা হয় সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএসে। সেখান থেকে বড় গাড়িতে লোড করে শেষ পর্যন্ত মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ফেলে আসা হয়। বর্জ্য বহনের জন্য মূলত ৩, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ টন ধারণক্ষমতার মাঝারি ও ভারী গাড়ি ব্যবহার করা হয়। এসব গাড়ি প্রতি রাতে তিন থেকে চারবার এসটিএস থেকে মাতুয়াইলে ট্রিপ দেয়। গাড়ি ও যাত্রাপথ অনুযায়ী প্রতি ট্রিপে ৮ থেকে ১৪ লিটার জ্বালানি তেল সরকারিভাবে বরাদ্দ থাকে। তবে তেলের অপচয় ও চুরির সিন্ডিকেট এখানে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অক্টোবরের সরকারি খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা ধরে এই ডিজেলের বাজারমূল্য ২৩ লাখ ৬৬ হাজার ১০ টাকা।
পৌর ফিলিং স্টেশনে কথা বলা এক স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী দেনা-পাওনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, কোন ট্রিপে ১২ লিটার তেল বরাদ্দ থাকলে অসাধু চালক ৮ বা ৯ লিটার তেল নেন। বাকি তেলের সমপরিমাণ নগদ টাকা পাম্পের অসাধু কর্মীদের কাছ থেকে বুঝে নেন। হিসাব মতে, মাসে গড়ে যদি ৫,৮৪২টি ট্রিপ হয় এবং প্রতিটি ট্রিপে অন্তত ৩ লিটার করে তেল সরানো হয়, তবে মাসে প্রায় ১৭,৫২৬ লিটার তেল চুরি যায়, যার আর্থিক মূল্য লাখ লাখ টাকা। এই অবৈধ অর্থের ভাগ পান কিছু চালক, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা। পাম্পের লোকেরা কাগজে হিসাব লিখে রাখেন। একই হারে এক বছর চললে এবং দাম অপরিবর্তিত থাকলে তা প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
ময়লার গাড়ির চালকদের নিয়োগ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসির পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার অবশ্য তেলের টাকা থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। চালক সংকটের বিষয়টি মেনে নিয়ে তিনি জানান, মাস্টাররোল বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মধ্যে যাঁদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা আছে, তাঁদেরই সাময়িকভাবে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, ‘একদম যে ভালো, আমি এটা বলব না। মাঝেমধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সহকারীদের গাড়ি চালাতে দেওয়া হয়, এটা সত্য।’ তবে সাংবাদিকের অনুসন্ধানের পর তাঁরা নিজেরাও নজরদারি শুরু করেছেন এবং এখন আর সহকারীদের গাড়ি চালাতে দেওয়া হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। স্থায়ী চালকের সংখ্যা ২৫২ বলে নিশ্চিত করেন ইউনিয়ন সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। পরিবহন পুল থেকে সেটি দেওয়া হয় হারুনকে।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বর্জ্য পরিবহনে অনিয়ম ও প্রাণহানির বিষয়ে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে একটি মানুষের অকালমৃত্যুও কেন হবে?’ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। পাশাপাশি তিনি জানান, দক্ষ ও বৈধ নতুন চালক নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং তদারকি কর্মকর্তাদের অবহেলা পাওয়া গেলেও তাঁদের ছাড় দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও প্রখ্যাত পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক এ বিষয়ে বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রশাসকেরা অনেক ক্ষেত্রে সাহসী উদ্যোগ নিলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন খাতে বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি ও কঠোর শৃঙ্খলা জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ময়লার গাড়ির চাপায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শুধু অনভিজ্ঞ প্রক্সি চালক বা সহকারীদের দায়ী করে পার পাওয়া যাবে না; সংস্থা হিসেবে মূল আইনি ও নৈতিক দায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকেই সম্পূর্ণ বহন করতে হবে।

