প্রোগ্রামিং ত্রুটিতে স্থবির বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবা
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে একটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ডিজিটাল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ত্রুটিটি সামনে আসার পর গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সরকার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিজেদের ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এই বিঘ্নের ফলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি ওয়েবসাইট, জার্মানির বিভিন্ন হাসপাতাল এবং ফ্রান্সের কর বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো অচল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বুধবার ও বৃহস্পতিবার সেগুলোর বিঘ্নে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘দ্য ট্রেইটার্স’-এর ওয়েবসাইটেও সাময়িকভাবে ত্রুটির বার্তা দেখা যায়।
নিরাপত্তা গবেষকদের মাধ্যমে ত্রুটিটি উন্মোচিত হওয়ার পরপরই পিএইচপি ফাউন্ডেশন দ্রুততম সময়ে এটি সংশোধনের জন্য একটি প্যাচ প্রকাশ করে। এই পদক্ষেপের কারণে বেশিরভাগ সেবা এক দিনের মধ্যেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, আজকের ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল সমাজে সামান্য একটি সফটওয়্যার ত্রুটিও কতটা বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের দেশ ফিনল্যান্ডে সরকারি পোর্টালগুলো বন্ধ থাকায় নাগরিকদের দৈনন্দিন কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হেলসিঙ্কির সফটওয়্যার নির্মাতা এবং নগর রাজনীতির সাথে যুক্ত কালে পুসা জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সাধারণ সরকারি সেবা নিতে গিয়েও তাকে ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যা ওই সময়ে অকার্যকর ছিল। তিনি বলেন, অনলাইন সেবাগুলো এখন সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। এতে নাগরিকদের দৈনন্দিন কিছু কাজও আটকে যায়। পুরোনো একটি সোফা সরিয়ে নিতে স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাছে আবেদন করতে চেয়েছিলেন পুসা। তৃতীয় পক্ষের অর্থ পরিশোধের সেবা বন্ধ থাকায় তাঁর নিজের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাজ্য সরকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে।
এছাড়া জার্মানির বার্লিন ও মিউনিখের মতো বড় শহরের ওয়েবসাইটগুলোতেও প্রভাব পড়ে। হ্যানোভার মেডিকেল স্কুলের কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের সিস্টেম নিরাপদ রয়েছে নিশ্চিত করলেও অনলাইন পরিষেবায় বিঘ্নের কথা স্বীকার করে। নেদারল্যান্ডসেও নাগরিকদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র যাচাই এবং অপরাধ বিষয়ক পোর্টালগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিল। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। তিনি নিজেও নিরাপত্তা হালনাগাদ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখেন। হ্যানোভার মেডিকেল স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যবহারকারীদের আশ্বস্ত করে জানায়, তাদের হাসপাতাল হ্যাক হয়নি।
ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ প্রিন্স জানিয়েছেন, ত্রুটিটি প্রকাশ্যে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেটি কাজে লাগানোর হাজারো প্রচেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ত্রুটি প্রকাশের ৪৫ মিনিটের মাথায় ১০ হাজার, দুই ঘণ্টার মধ্যে কয়েক লাখ এবং পরবর্তীতে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায় সাইবার হামলার চেষ্টা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ত্রুটির মাধ্যমে হ্যাকাররা সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরির সুযোগ পেত। প্রকাশ্যে আসার পর প্রথম ৪৫ মিনিটে এ ধরনের চেষ্টার সংখ্যা দশ হাজারে পৌঁছায়।
বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট এবং জনপ্রিয় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম যেমন ওয়ার্ডপ্রেস ও ড্রুপাল পিএইচপি ভাষায় নির্মিত, যা এই সংকটের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দেয়। নিউ ইয়র্কের সফটওয়্যার নির্মাতা শেথ কফম্যান জানান, বিপুল সংখ্যক সার্ভার এই ত্রুটির ঝুঁকিতে ছিল। নাইরোবির তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা অ্যান্থনি ওয়াম্বুয়া সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর ধীরগতির নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়ায় উদ্বেগ জানান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিএইচপির ব্যবহার কমতে থাকলেও বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনে ভাষাটি ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এই প্রোগ্রামিং ভাষাটি সহজ ও বিনা মূল্যে পাওয়া যায় বলে এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাকারী অ্যান্থনি ওয়াম্বুয়া জানান, ত্রুটির খবর পাওয়ার পর তিনি দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদের উদ্যোগ নেন।
যুক্তরাজ্যের যোগাযোগসেবা বিশেষজ্ঞ অ্যালিস্টার গ্লিভস জানান, বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এই বিঘ্ন সামাল দেওয়া সহজ হলেও অনেক ছোট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রায় সাত ঘণ্টা পর্যন্ত সেবা চালু করতে পারেনি, যা তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই ত্রুটি শনাক্ত হওয়া মূলত একটি ইতিবাচক দিক, যা ভবিষ্যতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। ফ্রান্সে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কর বিভাগের কিছু অনলাইন সেবা স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছে।

