ভীতি বনাম ভিত্তি: ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি শেখা

আমাদের দেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রচলিত ধারাটি এখনো অনেকটা মুখস্থনির্ভর।

পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা ব্যাকরণের নিয়ম, শব্দার্থ বা নির্দিষ্ট কিছু টেমপ্লেট মুখস্থ করার দিকেই বেশি নজর দেয়। এমন একটি চর্চাও আমি দেখেছি, যেখানে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু প্যারাগ্রাফ লেখার টেমপ্লেট মুখস্থ করানো হয়।

আইইএলটিএসের মতো উচ্চতর পরীক্ষার ক্ষেত্রেও অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলভাবে নিজের ভাব প্রকাশের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু বাক্য বা লেখার কাঠামো মুখস্থ করে পরীক্ষায় ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কিন্তু শুধু গৎবাঁধা টিপস বা টেকনিকের ওপর নির্ভর করে একটি ভাষায় সাবলীল হওয়া কঠিন। বাস্তব জীবনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইংরেজি ব্যবহার করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রায়শই দ্বিধায় ভোগে, এমনকি এসএসসি বা এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করেও অনেক শিক্ষার্থী নিজের চিন্তা সঠিকভাবে ইংরেজিতে প্রকাশ করতে গিয়ে হিমশিম খায়। শুধু কোনোভাবে পরীক্ষায় উতরে যাওয়ার জন্যও শেখানো হয় নানা রকম টিপস ও টেকনিক। গ্রামার না জেনে আপনি অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলোয় হয়তো পার পেয়ে যাবেন, কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিবেচনায় এই ধারণা ভুল।

একটি শিশুর ভাষা শেখার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে শিশু প্রতিটি বাক্যের ব্যাকরণ আলাদা করে শেখে না বা শব্দার্থ মুখস্থ করে না। পরিবারের সদস্যদের কথা শুনতে শুনতে এবং চারপাশের মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সে ভাষাটি আয়ত্ত করে। শৈশবে মানুষের মস্তিষ্ক ভাষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নমনীয় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশে বেড়ে ওঠা কোনো বাঙালি শিশু যদি পরিবারে বাংলা এবং বাইরের পরিবেশে ইংরেজি শোনে, তবে সে খুব সহজেই দুটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এজন্য তাকে আলাদা করে ব্যাকরণ শিখতে হয় না। এই বিষয়টি ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। নিয়মিত শোনা, বলা ও পড়ার মাধ্যমে ভাষার সঙ্গে স্বাভাবিক পরিচয় গড়ে তোলাটাই মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। সমাজ, বিজ্ঞান কিংবা আর আট দশটা বিষয়ের মতোই ইংরেজি শেখানোর প্রচলিত পদ্ধতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে গ্রামারের নিয়ম মুখস্থ করা, শব্দার্থ ও নানা রকম স্ট্রাকচার মনে রাখা। শৈশব থেকেই এই অভ্যাস গড়ে তোলা ভবিষ্যতে তাদের যোগাযোগ, জ্ঞানচর্চা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।

ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পরিচিত করার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাদের ভীতি দূর করে পরিবেশ তৈরি করা। গল্প শোনা, কার্টুন দেখা বা সহজ ইংরেজি বই পড়ার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে বাক্যের গঠন ও শব্দের প্রয়োগ বুঝতে শেখে। প্রথম দিকে উচ্চারণে সমস্যা বা বাক্য অসম্পূর্ণ থাকা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু ধারাবাহিক উৎসাহ পেলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ব্যাকরণের নিয়ম শেখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভাষাকে আরও শুদ্ধ ও নিখুঁত করে তোলে। আইইএলটিএস, টোয়েফল বা পিটিই-র মতো পরীক্ষায় ব্যাকরণ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মূল্যায়নের একটি বড় মাপকাঠি। তাই ইংরেজিকে ভয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে একটি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। স্কুল–কলেজজীবনে কঠিন বিষয় হিসেবে ইংরেজির প্রতি শিক্ষার্থীর যে ভীতি, সেই ভীতি কাটিয়ে কীভাবে এটিকে শুধু একটি ভাষা, বাংলার মতোই মনের ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, সে ব্যাপারে প্রত্যেক স্তরেই কাজ করা উচিত।

অভিভাবকদের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে ইংরেজি শেখার জন্য একটি আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশুরা যখন নিজেদের পরিচিত বিষয় নিয়ে সহজ বাক্যে কথা বলার সুযোগ পায়, তখন তাদের জড়তা কেটে যায়। বাসায় বিভিন্ন এনসাইক্লোপিডিয়া, ইংরেজি পত্রিকা, ম্যাগাজিন বা অভিধান রাখতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ভুল করলে শিশুকে লজ্জা না দিয়ে বরং তার কথা বলার আগ্রহকে উৎসাহিত করতে হবে। তবে মনে রাখা জরুরি, ইংরেজি শেখার কোনো শর্টকাট পদ্ধতি নেই। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চর্চা বজায় রেখে, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমেই ইংরেজি ভীতি জয় করা সম্ভব। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে ইংরেজি ভাষাটি শিক্ষার্থীদের কাছে একটি ভয়ের বিষয় না হয়ে বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী দক্ষতায় পরিণত হবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *