মায়ের অপেক্ষায় চার বছরের তাবাসসুম, ডেঙ্গুতে প্রাণ হারালেন জান্নাতুন
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার দক্ষিণ কাঞ্চনা গ্রামে এখন শোকের ছায়া। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন গৃহবধূ জান্নাতুন ফেরদৌস। গত ১০ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একই দিন বিকেলে গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে স্বামী জুবায়ের ও একমাত্র কন্যাসন্তান তাবাসসুমকে নিয়ে তার সাজানো সংসারটি ডেঙ্গুর ছোবলে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেছে।
নিহত জান্নাতুনের স্বামী জুবায়ের পেশায় একজন মোবাইল ব্যবসায়ী, যিনি কাজের প্রয়োজনে সপরিবারে চট্টগ্রাম নগরীর মাদারবাড়ী এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। জুবায়ের জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বর্তমানে মাদারবাড়ী এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে তিনি দাবি করেন। নিজের সুস্থতা ফিরলেও স্ত্রীকে বাঁচাতে না পারার বেদনায় তিনি এখন দিশেহারা। ভবিষ্যতে চার বছরের মেয়েকে বড় করার কঠিন চ্যালেঞ্জ এখন তার সামনে।
জান্নাতুনের অসুস্থতার বর্ণনা দিয়ে জুবায়ের জানান, শুরুর দিকে জ্বর অনুভব করলে চিকিৎসকের পরামর্শে তারা ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রস্ততি নেন। এর দুদিন পর জ্বর কমে গেলেও গত ৭ অক্টোবর পুনরায় তীব্র জ্বর দেখা দেয়। পরীক্ষায় জান্নাতুনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। প্রথমে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। গত ৯ অক্টোবর রাতে তাকে পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে সেখানে শয্যা না পেয়ে পরে পিসপার্ক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। চিকিৎসক জানান, জ্বর না কমলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রাতে ইসিজি রিপোর্ট আশঙ্কাজনক আসায় পরদিন তাকে দ্রুত চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ ওয়ার্ডে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর জান্নাতুনের বুকের তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং তিনি কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। দ্রুত তাকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি; সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি মারা যান। তখন তার বুকে ব্যথা হচ্ছিল, কথাও বলতে পারছিলেন না।
বর্তমানে দক্ষিণ কাঞ্চনা গ্রামের নিজ বাড়িতে জান্নাতুনের মৃত্যুর চতুর্থ দিনের জেয়াফতের প্রস্তুতি চলছে। শোকাহত পরিবারের সদস্যরা চার বছরের ছোট্ট তাবাসসুমকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। খেলতে খেলতে অথবা এদিক-সেদিক তাকালে শিশুটি এখনো তার মায়ের খোঁজ করছে, অথচ স্বজনদের আদরও যেন মায়ের শূন্যতা পূরণ করতে পারছে না। তার এই অবুঝ অপেক্ষার কোনো উত্তর নেই কারও কাছে। মায়ের অনুপস্থিতি যে কত দীর্ঘ হতে যাচ্ছে, তা হয়তো এই ছোট্ট শিশুটি এখনও বুঝতে পারেনি। কখনো স্বজনদের কোলে বসে খেলছে; কখনো এদিক-সেদিক তাকিয়ে খুঁজছে মাকে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সবার আদরেও মায়ের অভাব পূরণ হচ্ছে না।

