রাত নামলেই মৃত শিশু যেখানে ফেরত দেয় মুদ্রা
গভীর রাত। চারদিকে ঘন জঙ্গল। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ। কোথাও বাড়িঘর নেই, নেই পথবাতির আলো। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় যতটুকু দেখা যায়, তার বাইরে শুধুই অন্ধকার। হঠাৎ রিয়ারভিউ মিররে দেখা গেল দুটি হেডলাইট। পেছন থেকে দ্রুত এগিয়ে আসছে একটি গাড়ি। এমনই সব রোমহর্ষক গল্প ছড়িয়ে আছে নিউইয়র্ক সিটি থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে, নিউজার্সির একটি নির্জন সড়ককে ঘিরে। মাত্র ১০ মাইল দীর্ঘ এই সড়কটি এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ক্লিনটন রোড নামের এই পথটি রুট ২৩-এর কাছ থেকে শুরু হয়ে আপার গ্রিনউড লেক এলাকার দিকে চলে গেছে। দুই পাশে ঘন বন, জলাধার ও পাহাড়ি প্রকৃতি। কিন্তু সূর্য ডুবে গেলে পাল্টে যায় পরিবেশ। ঘন গাছপালার আড়ালে হারিয়ে যায় শেষ আলোটুকুও। দীর্ঘ নির্জন পথ, তীক্ষ্ণ বাঁক আর লোকালয়ের অনুপস্থিতি তৈরি করে এক অস্বস্তিকর অনুভূতি। চালক গতি বাড়ালে ট্রাকটিও গতি বাড়ায়। শেষ পর্যন্ত দুর্গটির অবশিষ্টাংশও অনেকাংশে সরিয়ে ফেলা হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে ভৌতিক সড়কের স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক গাড়ি ভাড়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সিক্সট (Sixt) কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৬ সালের এক তালিকায় ক্লিনটন রোড বিশ্বের সবচেয়ে ভৌতিক সড়কের প্রথম স্থান দখল করেছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নিউ হ্যাম্পশায়ারের কানকামাগাস হাইওয়ে এবং তৃতীয় স্থানে ক্যালিফোর্নিয়ার রুট ৬৬। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, এই সড়কটি নিয়ে গুগলে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার এবং টিকটকে দুই লাখ ৬০ হাজারের বেশিবার অনুসন্ধান করা হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর নিউইয়র্ক পোস্টও ক্লিনটন রোড নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই রহস্যময় সড়কের জনপ্রিয়তার কারণে ২০১৯ সালে ‘ক্লিনটন রোড’ শিরোনামে একটি হরর চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে, যেখানে অভিনয় করেছেন বিখ্যাত র্যাপার ও অভিনেতা আইস-টি। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ব্যবসায়ী রিচার্ড ক্রসের নির্মিত ‘ক্রস ক্যাসল’ একসময় ছিল বিশাল ব্যক্তিগত স্থাপনা।
রহস্যময় লোককাহিনি ও লোকজনের দাবি
ক্লিনটন রোড ঘিরে প্রচলিত গল্পগুলোর মধ্যে মৃত শিশুর মুদ্রা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি অন্যতম। কেউ কেউ দাবি করেন, গভীর অন্ধকারে তারা শিশুর অবয়ব দেখেছেন। তবে কেবল শিশুই নয়, আরও অনেক রহস্যময় বিষয় জড়িয়ে আছে এই সড়কের সঙ্গে। স্থানীয়দের মতে, এখানে চালকবিহীন হেডলাইট, রহস্যময় স্পোর্টস কার এবং রাস্তার পাশে মানুষের ছায়ামূর্তি দেখা যায়। দীর্ঘকাল ধরে এমন সব গল্পের পেছনে বিভিন্ন সময় শয়তানপূজা ও রহস্যময় আচার-অনুষ্ঠানের অভিযোগও উঠে এসেছে, যদিও এসব দাবির অনেকগুলোরই নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ১৯৮৩ সালের মে মাসে এই সড়কের পাশের বনাঞ্চল থেকে ড্যানিয়েল ডেপনার নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করার ঘটনাটি এই অঞ্চলের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আর আসন্ন হ্যালোইনকে সামনে রেখে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এর গা ছমছমে সব কাহিনি। ভূত, ডাইনি, রহস্যময় আলো, কালো পিকআপ ট্রাক কিংবা জঙ্গলের মধ্যে অদ্ভুত প্রাণী—কী নেই সেই গল্পে। সেতুর নিচে মৃত শিশু, মুদ্রা ফেললেই ফেরত দেয়। সেই শিশুর আত্মা নাকি আজও সেতুর আশপাশে ঘুরে বেড়ায়। প্রচলিত গল্পে বলা হয়, গভীর রাতে সেতুর নিচে মুদ্রা ফেললে কিছুক্ষণ পর সেটি রহস্যজনকভাবে ফিরে আসে। পাশের গভীর জঙ্গলে রয়েছে এক পুরোনো দুর্গের ইতিহাস। পরবর্তী সময়ে এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুজব ছড়ায়, গভীর রাতে সেখানে গোপন সংগঠনের সদস্যরা জড়ো হতেন। এমনকি বর্ণবাদী সংগঠন কু ক্লাক্স ক্ল্যানের গোপন সমাবেশের গল্পও শোনা যায়।
প্রশাসন ও স্থানীয়দের অবস্থান
সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক বিষয় হলো, ক্লিনটন রোডের এসব ভৌতিক গল্প নিয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের অবস্থান। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তারা সেখানে কখনো ভূত দেখেননি। প্রশাসনের মতে, এ ধরনের ভৌতিক গল্পের অধিকাংশ ভিত্তিহীন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, ভূত খোঁজার নামে স্থানীয় বাসিন্দাদের হয়রানি করা, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো কিংবা রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের কঠোর অবস্থানেও পর্যটক ও কৌতূহলী মানুষের আনাগোনা থামেনি, কারণ নিউজার্সির ওয়েস্ট মিলফোর্ডের এই বনাঞ্চলটি তার ভৌতিক খ্যাতির কারণে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রহস্যপ্রেমীদের আকৃষ্ট করছে। দিনের বেলা রাস্তাটি শান্ত মনে হলেও রাতের আঁধারে এর ভিন্ন রূপ কল্পনা করে পর্যটকরা সেখানে ছুটে যান, যা এই এলাকাটিকে বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সত্যিই কি এখানে অশরীরীদের আনাগোনা, নাকি মানুষের কল্পনা আর অন্ধকারের মিশেলে তৈরি হয়েছে এক বিস্ময়কর রহস্য। দিনের বেলায় অন্য দশটি গ্রামীণ সড়কের মতোই মনে হতে পারে ক্লিনটন রোডকে। স্থানীয় লোককাহিনি নিয়ে প্রকাশিত জনপ্রিয় সাময়িকী ‘উইয়ার্ড নিউজার্সি’ (ডবরৎফ ঘঔ) বছরের পর বছর ধরে ক্লিনটন রোডের বিচিত্র সব ঘটনা সংগ্রহ করেছে। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, বহু বছর আগে একটি ছোট্ট শিশু সেতু থেকে নিচের পানিতে পড়ে মারা যায়। ক্লিনটন ব্রুকের ওপর অবস্থিত একটি সেতু ও ‘ডেড ম্যানস কার্ভ’ নামের বাঁককে ঘিরেই এসব গল্পের বিস্তার।

