৭০ বছরের জীবনসঙ্গী নূরজাহানকে হারালেন ৮৮ বছর বয়সী সাজু
অভাবের তাড়নায় অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে অন্ন জোগানোর আকুতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছিলেন শেরপুরের বৃদ্ধ সাজু শেখ। বয়স তার ৮৮ বছর। প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝে প্রশাসন ও সহৃদয় ব্যক্তিদের সহায়তায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা অবশেষে কেড়ে নিয়েছে তাঁর ৭০ বছরের সঙ্গী নূরজাহান বেগমকে। ৮২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম রোববার দুপুরে নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ইলিয়াস মিয়া নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর তথ্যটি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি মারা যান। এরপর একই দিন বিকেল পাঁচটায় তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে। প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই নূরজাহান বেগম শয্যাশায়ী ছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যার অভাব তাঁর শারীরিক অবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছিল। তিনি বলেন, গতকাল নূরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে। এর পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না তিনি।
দীর্ঘ ৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনে নানা প্রতিকূলতা, অভাব ও সংগ্রামের মাঝেও একে অপরের পরম বন্ধু ছিলেন এই দম্পতি। বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া সাজু শেখ নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শেষ দিন পর্যন্ত স্ত্রীর সেবায় কোনো কমতি রাখেননি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, শয্যাশায়ী স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে খাবারের জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে কাঁদছেন। সেই অসহায়ত্বের দৃশ্য হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল অনেকেরই। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন মহলের সহযোগিতায় তাঁদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয় এবং কর্মসংস্থানের জন্য দেওয়া হয় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। তাঁর অসহায়ত্বের কথা জেনে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রশাসনের লোকজন। ধীরে ধীরে পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। স্ত্রীর অসুস্থতার পর সাজু শেখের জীবনও যেন থমকে যায়।
সাজু শেখ ও নূরজাহান দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ের সংসারে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তাঁদের তিন ছেলের একজন করোনা মহামারি চলাকালে নিখোঁজ হন। ঢাকায় রিকশা চালানো আরেক ছেলে বছরে মাত্র দু-একবার বাড়ি ফেরেন। শেরপুরে থাকা ছোট ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সংসার চালান। অভাবের সংসারে তিনিও নিজের অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসার অভাবে হারিয়েছিলেন। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ওই স্ত্রীর রেখে যাওয়া তিন মেয়েকে নিয়ে নূর ইসলাম বর্তমানে কঠিন জীবন অতিবাহিত করছেন। নিজের বার্ধক্য ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অসুস্থ স্ত্রীর দেখাশোনায় কার্পণ্য করেননি তিনি। একদিকে স্ত্রীর সেবা, অন্যদিকে খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো তাঁকে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর বিষয়টি অবগত আছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরিবারটির সহায়তায় প্রশাসন থেকে ঘর নির্মাণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং দেশ-বিদেশের অনেক মানুষও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ সাজু শেখের ভবিষ্যৎ দিনগুলো নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

