বাসযোগ্য শহর গড়তে তোইয়ামার স্মার্ট কৌশল
জাপানের তোইয়ামা শহর বর্তমানে এক নতুন নগর-ভাবনা নিয়ে কাজ করছে, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক শহরের জন্য একটি মডেল হতে পারে। জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং প্রবীণ নাগরিকের হার বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শহরটি ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমিয়ে গণপরিবহন ও পরিকল্পিত আবাসনের দিকে নজর দিচ্ছে। তোইয়ামার এই কৌশল বর্তমানে জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নগর-পরিকল্পনাবিদদের কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের ৫২টি শীর্ষ পর্যটন গন্তব্যের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া এই শহরটি কেবল পর্যটনেই নয়, বরং আধুনিক নগর পুনরুজ্জীবনেও নতুন পথ দেখাচ্ছে। হোনশু দ্বীপের জাপান সাগর উপকূলে অবস্থিত তোইয়ামা আকারে মাঝারি হলেও পরিচয়ে বহুমাত্রিক। পাহাড়, সমুদ্র, সামুদ্রিক খাদ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির টান শহরটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করেছে। তোইয়ামার এই নগর ভাবনা এবং এর প্রয়োগ কাছ থেকে দেখতে সম্প্রতি প্রথম আলোসহ টোকিওভিত্তিক বিদেশি গণমাধ্যমের কয়েকজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানায় শহর কর্তৃপক্ষ। এই বাস্তবতা নগর-পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে, কারণ শহরের অনেক মানুষ থাকেন শহরতলিতে এবং তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর।
গত ২৫ আগস্ট এক বিশেষ সফরে মেয়র হিরোহিসা ফুজিই সাংবাদিকদের সামনে শহরের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে তোইয়ামার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার, যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসার পূর্বাভাস রয়েছে। বর্তমানে শহরের প্রায় ৩০ শতাংশ বাসিন্দা প্রবীণ। এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে সরকারি সেবা ও পরিবহন ব্যবস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল, যার প্রেক্ষিতে তোইয়ামা একটি ‘কমপ্যাক্ট সিটি’ বা সুসংহত নগর মডেল গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব কারণে সরকারি সেবা, পরিবহন রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রবীণদের চলাচল—সবই ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছিল। এর অবকাঠামো নির্মাণে দায়িত্ব নেয় সরকার, আর সেবা পরিচালনায় যুক্ত হয় বেসরকারি খাত।
শহর পুনর্গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে তোইয়ামা লাইট রেল ট্রানজিট (এলআরটি) নেটওয়ার্ক। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবাকে মানুষের হাঁটার দূরত্বের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালে জাপানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এলআরটি চালুর পর থেকে ধাপে ধাপে শহরের চলাচলের মানচিত্র বদলে গেছে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সেন্ট্রাম লুপ লাইন, ২০১৫ সালের মার্চে শিনকানসেনের নিচ দিয়ে ট্রামলাইন সম্প্রসারণ এবং ২০২০ সালের মার্চে উত্তর-দক্ষিণ ট্রাম লাইন সংযোগের ফলে গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েছে। এর সুফল হিসেবে এক দশকের মধ্যে কর্মদিবসে এলআরটি ব্যবহার ২ দশমিক ১ গুণ এবং ছুটির দিনে ৩ দশমিক ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এলআরটি হলো পরবর্তী প্রজন্মের ট্রামব্যবস্থা।
ট্রানজিট-ভিত্তিক এই উন্নয়নের ফলে তোইয়ামা স্টেশন এখন শহরের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এলআরটি, স্থানীয় রেল ও শিনকানসেনের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক ট্রামগুলোতে বয়স্কদের জন্য নিচু মেঝে, বাধামুক্ত নকশা এবং আইসি কার্ডে ভাড়া পরিশোধের সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে, জমির দাম বেড়েছে এবং স্থানীয় সরকারের কর রাজস্বও শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে গণপরিবহনের সুবিধা আছে এমন এলাকায় বসবাসকারী মানুষের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। মেয়র হিরোহিসা ফুজিই এই হার ৪২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এই লক্ষ্য অর্জনে কেন্দ্রস্থলের কাছে নতুন বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ৫ লাখ ইয়েন পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে কেবল শহরের কেন্দ্র নয়, শহরতলির বাসিন্দাদের সুবিধাও এখন পরিকল্পনার বড় অংশ। এই লক্ষ্যে ২০২৬-২০৪৫ মেয়াদের একটি নতুন নগর মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ‘স্কিউয়ার্স অ্যান্ড ডাম্পলিংস’ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে, যেখানে গণপরিবহন হলো স্কিউয়ার্স এবং বিভিন্ন নাগরিক কেন্দ্র হলো ডাম্পলিংস। এর উদ্দেশ্য হলো শহরের একাধিক কেন্দ্র গড়ে তোলা, যাতে মানুষ সব সেবা সহজেই হাতের নাগালে পায়।
তোইয়ামার স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা এখন ভৌত অবকাঠামোর সাথে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে কাজ করছে। এর বড় অংশ হলো এআইভিত্তিক অন-ডিমান্ড কমিউনিটি বাস সেবা। স্মার্টফোনের মাধ্যমে যাত্রীরা রাইড বুক করলে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে একই দিকে যাওয়া যাত্রীদের মিলিয়ে সবচেয়ে কার্যকর রুট নির্ধারণ করা হবে। এটি বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক ও দূরের এলাকায় বসবাসকারীদের যাতায়াত সহজ করবে।
নাগরিক সেবার ডিজিটাল প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করা হবে ‘লাইন’ অ্যাপ। এর মাধ্যমে তথ্য পাওয়া, আবেদন করা, রিজার্ভেশন নেওয়া এবং সমস্যা জানানোর সুযোগ থাকবে। জরুরি সতর্কতা, দুর্যোগ বিষয়ক বার্তা, শিশু লালন-পালনসংক্রান্ত তথ্য, আবর্জনা সংগ্রহের সময়সূচী, ভালুক দেখার সতর্কতা, বাসস্থান সনদের আবেদন, মাই নম্বর কার্ড গ্রহণ কিংবা সড়কের অবকাঠামোগত সমস্যা জানানোর মতো সব সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনা হবে।
প্রবীণ নাগরিকদের স্মার্টফোনভিত্তিক সেবা ব্যবহারের বিষয়ে মেয়র জানান, প্রবীণদের এই নতুন প্রযুক্তির সাথে অভ্যস্ত করতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া অনলাইন কেনাকাটা, বুকিং এবং ‘লাইন’ অ্যাপ ব্যবহারে তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। তোইয়ামা সিটি কেবল একটি প্রযুক্তি প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে না, বরং শহর ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তিকে একটি ব্যবহারিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই ও সবার জন্য বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

