আল-জাজিরার সাংবাদিকদের ডিভাইসে ইসরাইলি স্পাইওয়্যার দিয়ে নজরদারি
কাতাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সাংবাদিকসহ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহৃত ডিভাইসে গোপনে নজরদারি চালানোর তথ্য সামনে এসেছে। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিটিজেন ল্যাব বৃহস্পতিবার একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এতে দেখা যায়, ইসরাইলি বিজ্ঞাপনপ্রযুক্তি সংস্থা ডিসকভার-টেকের সহায়তায় এবং নজরদারি সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরুর তৈরি স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিভাইসে এই অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়।
এর আগে ২০২১ সালে ক্ষতিকর সাইবার তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ইসরাইলি সাইবার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডিরুকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, ক্যান্ডিরুর স্পাইওয়্যার অতীতেও বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১০০ জন ব্যক্তি এ ধরনের সাইবার হামলার শিকার হয়েছেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নজরদারি অভিযানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বৃহস্পতিবার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে আল-জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক। গণমাধ্যমটি তাদের সংবাদকর্মীদের ওপর চালিত এই সাইবার আক্রমণকে সরাসরি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হামলা বলে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত জবাবদিহির মুখোমুখি করার দাবি জানানোর পাশাপাশি নিজেদের কর্মী ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে আল-জাজিরা। এ ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত ডিভাইসগুলো থেকে সংবেদনশীল যাবতীয় তথ্য হাতিয়ে নিতে সক্ষম এই ক্ষতিকর সফটওয়্যার। এর সাহায্যে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত নথি, ফাইল, ব্রাউজারের বুকমার্ক, সংরক্ষিত পাসওয়ার্ড ও সাইটে প্রবেশের এনক্রিপ্টেড ডাটা চুরি করা সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, ব্যবহারকারী কিবোর্ডে যা টাইপ করছেন তা রেকর্ড করা, পর্দার স্ক্রিনশট নেওয়া এবং ব্যবহারকারীর অজান্তে ডিভাইসের মাইক্রোফোন ও ওয়েবক্যাম চালু করে অডিও-ভিডিও সংগ্রহ করার ক্ষমতাও রয়েছে এর। এমনকি বিভিন্ন জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ও ই-মেইল বার্তার তথ্যও এটি সহজে সংগ্রহ করতে পারে।
ডিভাইসের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে এটি অত্যন্ত উচ্চমানের কৌশল অবলম্বন করে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের নজর এড়াতে সফটওয়্যারটি নিজস্ব এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে হাতিয়ে নেওয়া তথ্যগুলো ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করে নির্দিষ্ট সময় পর পর সার্ভারে পাঠায়। গবেষকদের ধারণা, অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি এই আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তিটির বাজারমূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার।
এই সাইবার আক্রমণের সূত্রপাত হয় আল-জাজিরার ভেতরের অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালে আল-জাজিরার নিজস্ব সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি দল প্রথম কয়েকজন সাংবাদিকের ব্যবহৃত ডিভাইসে সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখতে পায়। ২০২৫ সালেও ধারাবাহিকভাবে এই অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টি নিশ্চিত হতে সিটিজেন ল্যাবের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতার শরণাপন্ন হয়। আল-জাজিরার নিজস্ব তদন্তের সূত্র ধরে এ অনুসন্ধান চালানো হয়। তাদের মধ্যে স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতিবেদন করা কয়েকজন সাংবাদিকও রয়েছেন।
সিটিজেন ল্যাব জানায়, হামলার সময় আল-জাজিরার নিজস্ব নেটওয়ার্কে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে এই সাইবার হামলার পুরো সময়ক্রম ও কৌশল উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে এই যৌথ অনুসন্ধানের ফলেই সাইবার হামলার প্রকৃত ধরণ চিহ্নিত করা এবং তা প্রকাশ্যে আনা সম্ভব হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্যান্ডিরুর উদ্ভাবিত এই স্পাইওয়্যার ও এর ব্যবহারকারীরা সমসাময়িক উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার মতো অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আল-জাজিরার সাংবাদিকদের পাশাপাশি সংবেদনশীল বিষয়ে গবেষণারত আরও বহু ব্যক্তি ও সংবাদকর্মী এই গোপন নজরদারির মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন।

