গ্রামীণ জনপদকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করার উপায়

বাংলাদেশের বিশাল একটি অংশ জুড়ে রয়েছে গ্রাম। অথচ জাতীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গ্রামীণ মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। গত কয়েক দশকে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, বেড়েছে কৃষি উৎপাদন এবং উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এরপরেও অধিকাংশ গ্রামবাসীর জন্য উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্থায়ী আয়ের উৎস এবং ন্যায়বিচারের সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত। এই বিস্তর ফারাক কেবল আয়বৈষম্যের সূচক নয়, বরং রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কৃষি খাত বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ ও সেচ ব্যবস্থার কল্যাণে কৃষকের কঠোর পরিশ্রমে উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। উৎপাদন খরচের আধিক্য, মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট, ফসলের সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং বাজারজাতকরণে দর-কষাকষির সক্ষমতা না থাকায় কৃষকের প্রকৃত লাভ কমে যাচ্ছে। এছাড়া জমির পরিমাণ কমে আসা ও জনসংখ্যার চাপে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছে। ফলস্বরূপ, নতুন প্রজন্মের কাছে কৃষি আর আকর্ষণীয় পেশা থাকছে না, যা তাদের শহরমুখী করছে। অথচ শহরেও সবার জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষি থেকে শিল্প ও সেবামুখী অর্থনীতিতে উত্তরণ উন্নয়নের একটি স্বাভাবিক পর্যায়। তবে এই পরিবর্তনের ধকল যেন সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, তা রাষ্ট্রের নিশ্চিত করা জরুরি। দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্পের অংশ হিসেবে না দেখে সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সরকারি কর্মসূচির সুফল যেন সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য দুর্নীতি রোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন, আদালত বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা যদি কেবল হয়রানি বা প্রভাবশালীদের সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্র মানুষের কাছে সেবার বদলে কেবল দূরত্বেরই প্রতীক হয়ে উঠবে।

গ্রামের মানুষের এই দূরত্ব কমাতে কেবল আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। সেবা প্রদানের মান উন্নত করার পাশাপাশি অনিয়মের প্রতিকার ও অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরীক্ষা পদ্ধতি চালু করলে উন্নয়নের গতিপথ আরও সুসংহত হতে পারে। এছাড়া এনজিওগুলোর ভূমিকা গ্রামীণ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সহায়ক হলেও, উন্নয়নের সুফল থেকে কারা বাদ পড়ছে তা খুঁজে বের করাও সমান জরুরি। গ্রামীণ তরুণদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং স্থানীয় শিল্পের সাথে বাজারের সংযোগ স্থাপনের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন প্রয়োজন। ধর্মীয় শিক্ষা বা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তরুণরা মূলধারার অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। একইভাবে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন জরুরি। ভোটের সময় প্রার্থীদের সাথে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ থাকলেও বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামতের প্রতিফলন তেমন একটা দেখা যায় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত জনশুনানি আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ করতে হবে।

ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা হওয়া উচিত স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে। কোন গ্রামে সেচ, সড়ক, বাজার সংযোগ কিংবা স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা স্থানীয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করাই যৌক্তিক। এছাড়া কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে উৎপাদক সমবায় গঠন, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নের সাফল্য শুধু কত টাকা খরচ হলো বা কতটি স্থাপনা তৈরি হলো তা দিয়ে না মেপে, কতজনের স্থায়ী আয় বাড়ল বা কত তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেল—এই মানদণ্ডগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। গ্রামীণ মানুষকে করুণার পাত্র হিসেবে না দেখে উন্নয়ন ও অধিকারের সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনায় নিলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব ঘুচবে এবং জাতীয় অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হবে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *