নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর না হলে বাংলাদেশের সংকট আরও গভীর হবে
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে একটি পুরনো ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই — এটি কারখানা, কৃষি, শিক্ষা, রপ্তানি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আঘাত করছে। The Daily Star – Journalism without fear or favour-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এলএনজি, কয়লা ও তেলের উপর এই অতিনির্ভরতা দেশকে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার সামনে দুর্বল করে রেখেছে। সরকার এখন প্রতিদিন ২০০ কোটি টাকারও বেশি জ্বালানি ভর্তুকি দিতে বাধ্য হচ্ছে এবং বার্ষিক জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। যদি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তাহলে দেশ তাৎক্ষণিক সংকটে পড়তে পারে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২,৫০০ এমএমসিএফডির বেশি হলেও সরবরাহ কখনো কখনো ৮৫০ থেকে ৯০০ এমএমসিএফডিতে নেমে আসে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।
দেশের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদও অত্যন্ত সীমিত — মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ দিনের সমতুল্য। চীন বা জাপানের মতো দেশের তুলনায় এটি অনেক কম। তৈরি পোশাক খাতে গ্যাস সংকট এবং লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দিলেও গ্রামীণ অনেক এলাকায় গ্রীষ্মকালে দিনে ১০ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
অথচ সৌরশক্তি এই পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একটি ১ মেগাওয়াটের এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি বছর প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ব্যয় হয়, যার বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। অপরদিকে একটি ৫ মেগাওয়াটের সৌর প্রকল্পে মাত্র ২৫ কোটি টাকার একবারের বিনিয়োগেই কাজ হয়ে যায় এবং এরপর জ্বালানি খরচ প্রায় শূন্য। প্রতিটি ১ মেগাওয়াট সৌরশক্তি বছরে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারে।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রায় ৭ শতাংশ কংক্রিট বা কাঠামো দিয়ে ঢাকা, যা ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। এর মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহার করলেও প্রায় ৩০০ গিগাওয়াট সৌরশক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়, যেখানে দেশের পিক ডিমান্ড মাত্র ১৬ থেকে ১৮ গিগাওয়াট।
তবে নবায়নযোগ্য শক্তির পথে বাধাও কম নয়। সৌরশক্তি সরঞ্জামের আমদানিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শুল্ক ও কর আরোপ রয়েছে। সোলার পিভি মডিউলে ২৬.৯০ শতাংশ, সোলার ইনভার্টারে ২৮.৭৩ শতাংশ এবং ডিসি ক্যাবল ও অ্যালুমিনিয়াম মাউন্টিং স্ট্রাকচারে ৫৮.৪০ শতাংশ পর্যন্ত মোট শুল্কহার বিদ্যমান। এসব কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
পূর্বে বাতিল বা স্থগিত হওয়া ৩১টি সৌর প্রকল্প, যার মোট ক্ষমতা ৩,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি এবং যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে ২০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছেন, সেগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১০,৮০০ কোটি টাকা জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব।
নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর কেবল পরিবেশগত প্রশ্ন নয় — এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং শিল্প প্রতিযোগিতার প্রশ্ন। প্রতিটি ১ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পে ২০ থেকে ২৫টি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও সাহসী পদক্ষেপ।
Source: The Daily Star – Journalism without fear or favour





