বিদেশে বসে দেশের সম্পত্তি বিক্রির হিড়িক
দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা দেশে থাকা তাদের নিজস্ব বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। অনেকে সশরীরে দেশে না এসেই পরিচিতজন, বিভিন্ন সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে ক্রেতা খুঁজছেন। ক্রেতা নিশ্চিত হলে বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন করার মাধ্যমে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান বা শিল্পকারখানা হস্তান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা। তবে এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত বিক্রয়মূল্য গোপন করা, নামমাত্র কর দেওয়া এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ বৈধ পথে বিদেশে না নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সম্পত্তি নিবন্ধনের সময় দলিলের ওপর প্রকৃত দামের চেয়ে কম মূল্য প্রদর্শন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া বিক্রয়মূল্যের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে না নিয়ে বিদেশে বসে নগদ অর্থ বা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এমন লেনদেনের ফলে অর্থের বৈধ উৎস নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যা রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় ও আর্থিক খাতের স্বচ্ছতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রবাসীদের আইনি অধিকার থাকলেও, বিক্রয়মূল্য ঘোষণা, কর পরিশোধ এবং অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
প্রবাসীদের এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট কাজ করছে। সন্তানদের বিদেশে স্থায়ী হওয়া কিংবা বিদেশে জন্ম নেওয়া উত্তরাধিকারীদের পৈতৃক ভিটার চেয়ে নগদ অর্থের প্রতি আগ্রহ বেশি হওয়ায় অনেকে জমি-বাড়ি বিক্রি করতে চাইছেন। পাশাপাশি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ, ভাড়া আদায় বা দেখাশোনার মতো দূরবর্তী কাজগুলো করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে বিদেশে বাড়ি কেনা বা ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে।
সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের নানামুখী আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সাধারণত সম্পত্তি বুঝে পেতে বা নামজারি করতে মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, পরিচয়পত্র ও বণ্টননামার মতো নথিপত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় অনেকের এনআইডি, জন্মনিবন্ধন বা পাসপোর্টের তথ্য হালনাগাদ নেই, যা নথিপত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর করে তোলে। এই জটিলতাগুলো অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি হস্তান্তর ও উত্তরাধিকারীদের মধ্যে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে, বিশেষ করে যখন সম্পত্তির মূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
অর্থ স্থানান্তর সংক্রান্ত প্রক্রিয়াটি প্রবাসীদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ স্থানান্তরের জটিলতার কারণে অনেকেই হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নিচ্ছেন। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আইনি ও করসংক্রান্ত ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের বৈধ উৎস প্রমাণ করা আবশ্যক। অনিয়মতান্ত্রিক লেনদেনের ফলে এই অর্থ করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা পরে বড় ধরনের আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা মনে করছেন, সম্পত্তি বিক্রির অর্থ নিরাপদে ও বৈধ উপায়ে বিদেশে নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা প্রয়োজন। তাদের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি উঠেছে, যেখানে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্রের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হবে। সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব অনুযায়ী, অর্থের উৎস যাচাই ও নির্ধারিত কর পরিশোধের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে অর্থ স্থানান্তরের একটি কার্যকর পদ্ধতি প্রবর্তন করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিষয়গুলোও সমান্তরালভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি। যদি সরকার স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ সহজতর করে, তবে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেন অনেকাংশেই কমে আসবে।

