যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পূর্বাভাস

যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংকটের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে বলে দেখা গেছে। গত ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোসের চার দিনব্যাপী সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক, যা দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় ১ শতাংশ পয়েন্ট কম। বর্তমান পরিস্থিতিতে আজ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের এবং মাত্র ৩৫ শতাংশ রিপাবলিকান পার্টিকে ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের এই ১২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান চলতি নির্বাচনী চক্রে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ, যা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে তাদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে তুলেছে। নারী ভোটারদের মাঝেও একই প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যেখানে ৫০ শতাংশ নারী ডেমোক্র্যাটদের এবং মাত্র ৩২ শতাংশ রিপাবলিকানদের সমর্থন দিচ্ছেন। অন্যান্য প্রধান জরিপগুলোতেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাসের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত ৮ অক্টোবরের জরিপ বলছে, ট্রাম্পের ওপর সন্তুষ্টির হার নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে এবং প্রায় ৬৮ শতাংশ নাগরিক তাঁর প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছেন। এছাড়া এপি-এনওআরসির ১ অক্টোবরের জরিপ অনুযায়ী, ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের ভূমিকার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে সামরিক অভিযানের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের ভেতরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় দ্রুত পতন ঘটে। অর্থনীতি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারার কারণে ৬৮ শতাংশ নাগরিক তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ, যার মধ্যে ৩৭ শতাংশ নিজেদের রিপাবলিকান সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন। পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ৪৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন যে তাঁদের আসন্ন ভোট মূলত ট্রাম্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতি সরাসরি বিরোধিতার বহিঃপ্রকাশ। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে এই বিপর্যয় ডেমোক্র্যাটদের প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থার প্রমাণ নয়, বরং ভোটাররা মূলত ট্রাম্পের নীতি ও নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বিরোধী পক্ষকে বেছে নিচ্ছেন। জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ডেভিড ওয়াসারম্যানের তথ্য মতে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী ৩৭টি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় ডেমোক্র্যাটরা ৪৯ শতাংশ এবং রিপাবলিকানরা ৪৭ শতাংশ সমর্থনে এগিয়ে রয়েছে, যা গত ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এছাড়া সম্পাদক এরিন কোভি গত ১৬ অক্টোবরের বিশ্লেষণে ওহাইও, নেব্রাস্কা ও কানসাসের মতো রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোর ১১টি আসনের অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে সংশোধন করেছেন। ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেও বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। গত ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁকে ভোট দেওয়া ৯৫ শতাংশ নাগরিক শুরুতে পাশে থাকলেও বর্তমানে সেই হার কমে মাত্র ৬৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে মূলধারার বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারিত হবে প্রধান দুই দলের প্রতিই অসন্তুষ্ট ভোটারদের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত এবং আগামী ৩ নভেম্বরের কেন্দ্রভিত্তিক উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে সামরিক অভিযানের পর বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মার্কিনীদের জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামে। অর্থনীতি, নিত্যপণ্যের উর্ধ্বমুখী দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ক্ষতিকর শুল্কনীতি এবং বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম মার্কিন ভোটারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি করেছে। একের পর এক প্রকাশ পাওয়া জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনসমর্থনে রেকর্ড ধস দেখা গেছে এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। এটি তাঁর দুই মেয়াদে সর্বনিম্ন অনুমোদনের হার। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ‘রিয়েল টাইম’ উপস্থাপক বিল মাহের পডকাস্টে মন্তব্য করেন, ট্রাম্প আর আগের সেই ‘কিং কং’ নন এবং ভোটাররা ব্যালট বাক্সে তাঁদের অসন্তোষের প্রকাশ ঘটাবেন। একই সুর ধ্বনিত হয়েছে নির্দলীয় বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট’-এর মূল্যায়নেও।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *