ইয়েমেন সংঘাত ও আমেরিকার নীতিতে চাপে পড়েছে সৌদি আরব

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ব তেলবাজারে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক প্রভাব কমে আসার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে এক কঠিন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে রিয়াদ। দেশটির কৌশলগত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদার খোঁজার তাগিদ বাড়ছে। তবে নতুন এই নির্ভরশীলতা রিয়াদের জন্য ভিন্ন ধরনের বাধ্যবাধকতা ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন কারণে তৈরি হওয়া এসব পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে সৌদি আরবকে দাঁড় করিয়েছে—নিজের ক্ষমতার প্রধান উপকরণগুলোই যখন বহিরাগত শক্তির দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠছে, তখন দেশটি কতটা স্বাধীনভাবে নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?

যুদ্ধের ইতিহাস ও সৌদি-ইয়েমেন সংঘাতের অনুঘটক

সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও সামরিক দ্বন্দ্ব নতুন করে সামনে এসেছে। রিয়াদ ঐতিহাসিকভাবে এমন একটি ইয়েমেন দেখতে চায়, যা আরব উপদ্বীপে তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাব মুক্ত থাকবে। তবে বহু বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিপর্যস্ত ও বিভক্ত ইয়েমেন এখন এমন এক সামরিক শক্তির ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে, সেখান থেকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে সহজেই আঘাত হানা সম্ভব হচ্ছে।

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিরোধের শিকড় দেশটির প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৩৪ সালের যুদ্ধ, তায়েফ চুক্তি এবং আসির, জিজান ও নাজরান অঞ্চল নিয়ে বিরোধ দুই দেশের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ২০০০ সালে সীমান্ত চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হলেও অতীতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ক্ষত পুরোপুরি মুছে যায়নি। দশকের পর দশক ইয়েমেনের রাজনৈতিক, গোত্রীয় ও ধর্মীয় ভারসাম্যের ওপর সৌদি আরবের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা উল্টো প্রতিরোধ আন্দোলনকেই শক্তিশালী করেছে।

১৯৯০-এর দশকে জায়েদি পুনর্জাগরণ এবং পরে সানার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ এসব প্রতিরোধ আন্দোলনকে সামরিক রূপ দেয়। ইরান দীর্ঘদিনের এই আঞ্চলিক বিভাজনকে কাজে লাগিয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে শুরু হওয়া পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ইয়েমেনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। এতে অতীতের ক্ষোভ আরও গভীর হয় এবং হুথিরা নতুন সমর্থক সংগ্রহের সুযোগ পায়। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আলোচিত রোডম্যাপ সাময়িকভাবে সংঘাতের গতি কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ে রিয়াদ নতুন সংকটে পড়ে। যুদ্ধবিরতি ভাঙার কারণ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধও জড়িয়ে গেছে। হুথিদের দৃষ্টিতে সৌদি আরবকে আঘাত করার অর্থ উপদ্বীপে ওয়াশিংটনের প্রধান অংশীদারকে তার কথিত অবস্থানের জন্য মূল্য দিতে বাধ্য করা।

রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সৌদি আরামকোর কৌশলগত স্থাপনা এবং বেসামরিক অবকাঠামোয় সংঘাতের প্রভাব পড়ার ফলে ঐতিহাসিক এই বিরোধ এখন সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন খাতের বিকাশ, বিমান চলাচল বৃদ্ধি এবং একক তেলভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বহুমুখী অর্থনীতি গড়ার বৈপ্লবিক লক্ষ্যমাত্রার জন্য নিচ্ছদ্র নিরাপত্তা অপরিহার্য।

ঝুঁকি এখন দেশটির জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথগুলোকেও ঘিরে ফেলছে। ইরাক থেকে পরিচালিত হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর ফলে সৌদি আরবের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ইউরোপের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে পুরো অঞ্চলের আকাশসীমা ও নৌপথের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা ও ওয়াশিংটনের ভূমিকা

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরীক্ষা চলছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে তার প্রধান মিত্রের নিরাপত্তা থেকে আলাদা করেও নিজের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্বার্থ নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতা করতে পারে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার মুখে সৌদি আরব যখন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়েছিল, তখন ওয়াশিংটন দ্রুত যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার নীতি বেছে নেয়।

মাসকাটে হওয়া কূটনৈতিক সমঝোতার পরিণতিতে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনা রিয়াদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ নিরাপত্তা উদ্বেগের মুখে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা সংকুচিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘মক্কা চুক্তি’কে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা তৈরির নতুন উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের মতো পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতার নীতি এতে অনুসৃত হওয়ার কথা। চুক্তির ভাষা কাগজে-কলমে শক্তিশালী মনে হলেও বাস্তবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব সার্বভৌম রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

তবে লোহিত সাগরে হামলা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রিয়াদের কৌশলগত অবস্থানও বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ইতোমধ্যে সক্রিয় করা হয়েছে এবং নীতিগতভাবে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে অনীহা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার আরও বৈচিত্র্যময় কাঠামো গড়ে ওঠার পথ তৈরি করছে। ফ্রান্স ইয়ানবু বন্দর রক্ষায় সামরিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে, যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা বাড়াচ্ছে, এবং তুরস্ক এই জোটে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতা এবং ২০২৩ সালে রিয়াদ-তেহরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখা চীন এখানে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। সৌদি আরবের ওপর মার্কিন চাপ দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে সরে আসতে উৎসাহিত করতে পারে। তবে একাধিক শক্তির ওপর নতুন নির্ভরশীলতা রিয়াদের নীতি নির্ধারণে নতুন জটিলতা আনবে।

বিশ্ব তেলবাজার ও অর্থনৈতিক প্রভাব

নিরাপত্তা নিশ্চয়তা যখন শর্তসাপেক্ষ হয়ে উঠছে, তখন সৌদি আরব বিশ্ব অর্থনীতিতে তার ঐতিহাসিক প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সৌদি আরবের ক্ষমতা শুধু নিজের উৎপাদিত তেলের বিপুল পরিমাণের ওপর নির্ভর করেনি; বরং অন্য উৎপাদকদের তেল মাটির নিচে রেখে দেওয়ার বিষয়ে সম্মত করানোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষমতার ওপর নির্ভর করত।

অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) এবং পরে ওপেক প্লাস জোট এই সমন্বিত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণকে তেলের বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক থেকে নীতিগতভাবে বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থান বা স্বতন্ত্র নীতির ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম বড় উৎপাদক দেশটি সম্মিলিত উৎপাদন সীমাবদ্ধতার বাইরে আরো তেল উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছে।

একইভাবে ইরাকও নিজের তেলের উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরো উৎপাদন স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছে। তবে দেশটির তেল আয়ের সঙ্গে এমন একটি আর্থিক কাঠামো জড়িত, যার পরিচালনা ও তদারকির ওপর ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সৌদি আরবের হাতে অবশ্য হঠাৎ উৎপাদন বাড়িয়ে তেলের দাম কমিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের চাপে ফেলার পুরোনো কৌশল এখনো রয়ে গেছে। ২০২০ সালে তেলের উৎপাদন অভূতপূর্ব বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার ওপর কৌশলগত চাপ তৈরি করা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মস্কোকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

কিন্তু বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে তেলমূল্য যুদ্ধ শুরু করলে সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনাও বড় ধরনের স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কারণ তেলের কম দাম দেশটির অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সংস্থান কঠিন করে তুলবে। এটি রিয়াদের নিজস্ব জনগণের কাছে সরকারের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিশ্ব মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বের দাবির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।

এছাড়া ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে নতুন করে আইনি অভিযোগ ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি কীভাবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, পর্যালোচনায় সে দিকেও স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত সংকট নিরসনে রিয়াদকে এখন নিজস্ব সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও নতুন মিত্র খোঁজার মধ্যে সুক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *