হামের টিকা দেওয়ার পরও অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে না ২৭ শতাংশ শিশুর

হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে আয়োজিত প্রথমবারের মতো একটি গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা দেওয়ার পরও প্রায় ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার কার্যকারিতা ও সামগ্রিক টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে সরকারকে দ্রুত নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। ২১টি বা ৬.৮ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি সীমান্ত এলাকায় (বর্ডার লাইন)। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি। ৭০ জন দেশি–বিদেশ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।’।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছে আইইডিসিআর। এতে সহযোগিতা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক এবং ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ। মোট ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তার সমন্বয়ে এই গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। মূলত এ বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর এই কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। এ ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চান।

আইইডিসিআরের নেতৃত্বে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জের ছয়টি উপশহর ও গ্রাম এলাকার ৩০৯টি শিশুকে গবেষণার আওতায় আনা হয়েছিল, যাদের বয়স ছিল ৯ থেকে ৫৯ মাস। টিকা কার্ড যাচাই এবং অভিভাবকদের তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ২০৩ জনের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৬৫.৭ শতাংশ। এছাড়া ২১ জন শিশুর অ্যান্টিবডি বর্ডারলাইন পর্যায়ে ছিল, আর ৮৫ জনের শরীরে কোনো অ্যান্টিবডিই তৈরি হয়নি। স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিশুর শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠার কথা। আইইডিসিআরের বর্তমান গবেষণায় এই হার অনেক কম। টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারির মতে, পরিবহন বা সংরক্ষণের সময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রার হেরফের হলে টিকার মান কমে যেতে পারে। এছাড়া শিশুদের চরম অপুষ্টিও টিকা কম কার্যকর হওয়ার একটি বড় কারণ হতে পারে। আবার ১২ মাস বয়সে টিকা দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি বলেন, ‘টিকার কার্যকারিতা নষ্ট বা হ্রাস পেতে পারে একাধিক কারণে।

এদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি একে ‘ছোট গবেষণা’ হিসেবে অভিহিত করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি জানিয়েছেন, তিন হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে বড় পরিসরে আরেকটি গবেষণা চলমান রয়েছে, যার ফলাফল নভেম্বরের শেষ নাগাদ প্রকাশ করা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০৪ জন। এছাড়া গবেষণায় এটিও স্পষ্ট হয়েছে যে, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৯২ শতাংশই কোনো টিকা পায়নি। ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে হামের টিকা। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এ বছর হামে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৩৩ জনের।

সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের উপরে নিতে হবে। তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। একপর্যায়ে এই বয়সসীমা ১৮ বছর পর্যন্ত উন্নীত করা উচিত। এছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর নিয়মিত টিকাদান ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি জানিয়েছেন, টিকার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই, কারণ এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তবে তিনি টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে শিশুর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন।

টিকা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ব্যবহৃত সব টিকাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত। তবে দেশে এখনো এই টিকার মান নিয়মিত যাচাই করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। বিষয়টিকে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার ফলে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

গবেষকেরা মনে করেন, এক ডোজের তুলনায় দুই বা তিন ডোজ টিকায় প্রতিরোধক্ষমতা বেশি তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল কভারেজ বাড়ানোই নয়, বরং টিকা দেওয়ার বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক শিশু ক্রমবর্ধমান বয়সের সাথে সাথে সুরক্ষার বাইরে চলে যাবে।

জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত টিকা কর্মসূচি থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু বাদ পড়ে বলে বিভিন্ন পর্যালোচনা থেকে উঠে এসেছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করতে পারলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল এখন বৃহত্তর গবেষণার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে, যা নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের কাছ থেকে গবেষণার সারসংক্ষেপ পেয়েছে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *