বার্সেলোনা থেকে লন্ডন জয়: চোট কাটিয়ে পুতেয়াসের তৃতীয় ব্যালন ডি’অর অর্জন

বার্সেলোনার উত্তরে ছোট্ট এক শহর মোলেত দেল ভালেস। সেখানকার রাস্তায় ফুটবল খেলে বড় হওয়া এক ছোট্ট মেয়ে বাড়িতে দিনরাত টেলিভিশনে ফুটবল দেখত। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ের জাদু, রিভালদো ও রোনালদিনহোর নৈপুণ্য তাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত। সুযোগ পেলেই সে ছুটে যেত বার্সেলোনার বিখ্যাত স্টেডিয়াম ক্যাম্প ন্যুতে। গ্যালারিতে বসে কাতালান ক্লাবটির ম্যাচ দেখা এবং বড় তারকাদের অনুসরণের সেই স্বপ্নই তাকে একদিন নিয়ে যায় সাফল্যের শিখরে। সেই মেয়েটিই কালের পরিক্রমায় হয়ে ওঠেন বার্সেলোনার অনন্য ফুটবল রানি আলেক্সিয়া পুতেয়াস। ফুটবল বিশ্বে তিনি পরিচিত ‘লা রেইনা’ নামে, স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘রানি’। অথচ চার বছর পর সেই পুতেয়াস আবার বিশ্বসেরা। কখনো মাঝমাঠ থেকে এমন পাস দেন, যাতে প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণই এলোমেলো হয়ে যায়।

তবে এই ফুটবলের রানির ক্যারিয়ারের রাজপথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০২২ সালে ইউরোর ঠিক আগে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) পাওয়া মারাত্মক চোট তাঁর ক্যারিয়ারকে এক অনিশ্চিত আঁধারে ঠেলে দিয়েছিল। সেই বছর দ্বিতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতলেও চোটের কারণে মাঠে তাঁর আগের সেই বিধ্বংসী রূপ দেখা যাচ্ছিল না। ২০২৩ সালে স্পেন নারী ফুটবল দল বিশ্বকাপ জয় করলেও পুতেয়াসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। যে ফুটবলার একসময় ছিলেন দলের মূল প্রাণ, তাঁকেই কি না বিশ্বজয়ের উৎসবে থাকতে হলো অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে! তবে এমন কঠিন পরিস্থিতি ও মানসিক টানাপোড়েন তাঁকে কাবু করতে পারেনি। পুতেয়াসের জীবনেও এসেছিল তেমন এক সময়।

চোট কাটিয়ে মাঠে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

আঘাত সামলে পুতেয়াস ধীরে ধীরে নিজেকে পুরনো মেজাজে ফিরিয়ে আনেন। ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করে নিজের শক্ত অবস্থানের জানান দেন তিনি। এরপর ২০২৫-২৬ মৌসুমে ফুটবল বিশ্ব পুরোপুরি ফিরে পায় সেই পুরনো ও দুর্দান্ত পুতেয়াসকে। বার্সেলোনার হয়ে জিতে নেন চারটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি। অধিনায়ক হিসেবে দলকে এনে দিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। এর মাঝে সতীর্থ আইতানা বোনমাতি চোটের কারণে পাঁচ মাস মাঠের বাইরে থাকায় দলের আক্রমণ গড়ে তোলার বড় দায়িত্বও নিতে হলো তাঁকে। নিজের কাঁধে সমস্ত ভার তুলে নিয়ে তিনি বার্সেলোনাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং প্রতিটি প্রতিযোগিতায় অবদান রাখেন। এই প্রতিযোগিতায় তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু এভা পায়োর (১১), আলেসিয়া রুসো (৯) ও পারনিলে হার্ডার (৮)। এ যেন হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর আবার নিজের রংতুলি ফিরে পাওয়ার কাহিনি। পুতেয়াসের ফুটবলকে শুধু গোল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। তাঁর ওপরে শুধু ক্লদিয়া পিনা (১৯৯), ভিকি লোপেজ (১৮৩) ও জর্জিয়া স্ট্যানওয়ে (১৬৮)।

পরিসংখ্যানের বিচারে গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পুতেয়াস করেছেন ২১টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১৩টি গোল। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২১ গোল করেছেন।

কেবল চ্যাম্পিয়নস লিগেই তিনি ৭টি গোল উপহার দেন। চ্যাম্পিয়নস লিগেই করেছেন ৭ গোল।

টানা সপ্তমবার স্প্যানিশ লিগ জেতা বার্সেলোনার হয়ে লিগ ম্যাচে ৭টি অ্যাসিস্টের পাশাপাশি ওপেন প্লে থেকে গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪০টি। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে যা চতুর্থ সর্বোচ্চ। এছাড়া সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ৮৯টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন, যার মধ্যে ১৯টিই ছিল নিশ্চিত বড় সুযোগ। আক্রমণভাগের শেষ এক-তৃতীয়াংশে তাঁর সফল পাসের সংখ্যা ৯৬৫টি। চ্যাম্পিয়নস লিগে এককভাবে ৩৬টি সুযোগ তৈরি করে নিজের পুরোনো শ্রেষ্ঠত্বকে নতুন করে প্রমাণ করেন এই স্প্যানিশ তারকা। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ওপেন প্লে থেকে শটে শেষ হওয়া আক্রমণের ধারায় পুতেয়াসের অংশগ্রহণ ছিল ১৫১ বার।

ব্যালন ডি’অরে স্প্যানিশ আধিপত্য ও নতুন রেকর্ড

মাঠের এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে ২০২৬ সালে আবারও বিশ্বের সেরা নারী ফুটবলার নির্বাচিত হন পুতেয়াস। ৩২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো মেয়েদের ব্যালন ডি’অর ট্রফি হাতে তুললেন। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন স্বদেশি ও ক্লাব সতীর্থ আইতানা বোনমাতির টানা তিনবার ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ড। ২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার পুরস্কারটি জিতেছিলেন পুতেয়াস। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্বসেরার মুকুট ওঠে বোনমাতির মাথায়। এবার আবারও সিংহাসন উদ্ধার করলেন পুতেয়াস। ২০২১-২২ মৌসুমে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেনের ৩৮টির পর এক আসরে এটাই সর্বোচ্চ। মেসি এবার ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, অন্যরা কে কত নম্বরে।

  • মেয়েদের ফুটবলে টানা ছয় বছর ব্যালন ডি’অর পুরস্কার গেল স্প্যানিশ ফুটবলারদের ঝুলিতে।
  • ২০১৮ সালে নরওয়ের আডা হেগেরবার্গ এবং ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেگان র‍্যাপিনো ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আর কোনো দেশের ফুটবলার এই ট্রফি ছুঁতে পারেননি।
  • এবারের ভোটে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন বার্সেলোনার পোলিশ স্ট্রাইকার এভা পায়োর এবং তৃতীয় স্থান পান ম্যানচেস্টার সিটির ইংলিশ তারকা।

বার্সেলোনার দীর্ঘ পথচলা ও নতুন ক্লাবে যোগদান

বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে জন্ম নেওয়া পুতেয়াস শৈশবে জাভির পরিচালিত গ্রীষ্মকালীন ফুটবল ক্যাম্প এবং স্থানীয় ক্লাব সিই সাবাদেলে খেলে দক্ষতা বাড়ান। এরপর বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’ হয়ে ২০১২ সালে মূল দলে জায়গা করে নেন। বার্সেলোনার সঙ্গে দীর্ঘ ১৪ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক ও আবেগঘন সম্পর্কে তিনি মোট ৩৮টি ট্রফি জিতেছেন, যার মধ্যে ১০টি লিগ শিরোপা এবং ৪টি ইউরোপিয়ান কাপ রয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমের শেষে বার্সেলোনার সঙ্গে তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ১৪ বছরের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ ছিল না, তবে নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার তাড়নায় তিনি কাতালান ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মেয়েদের দলটি ভেঙে যাওয়ায় ছাড়তে হয় বার্সেলোনা। কিন্তু সব প্রেমের গল্পের শেষটা এক রকম হয় না। তারপর কেটে গেছে ১৪ বছর।

বার্সেলোনা ত্যাগের আগে জুনে ইংল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারানোর ম্যাচে আন্তর্জাতিক ফুটবলে জোড়া গোল করে স্পেনকে ২০২৭ বিশ্বকাপের মূল পর্বে তুলে দেন পুতেয়াস। এরপর ইংল্যান্ড, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে একাধিক আকর্ষণীয় প্রস্তাব পেলেও তিনি বেছে নেন মার্কিন ধনকুবের মিশেল কাংয়ের মালিকানাধীন উইমেনস সুপার লিগের ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসকে। জুলাইয়ে ইংলিশ ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর নিজের সেরা ফর্ম বজায় রেখেছেন। নতুন ক্লাবের হয়ে প্রথম সাত লিগ ম্যাচেই তিনি ৩টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট সম্পন্ন করেছেন, যা প্রমাণ করে ৩২ বছর বয়সেও তাঁর পায়ের জাদুকরী ক্ষমতা আগের মতোই নিখুঁত। ইংল্যান্ডের লায়নেসদের বিশ্বকাপে ওঠার আশা শেষ করে দেওয়ার পরের মাসেই কি না নিজে পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডে। নতুন ক্লাবে প্রথম সাত লিগ ম্যাচে করেছেন ৩ গোল, অ্যাসিস্ট ১টি। ৩২ বছর বয়সেও তাঁর পায়ে ফুটবলের জাদু যে ফুরিয়ে যায়নি, সেটি বোঝানোর জন্য এই সংখ্যাই যথেষ্ট।

নতুন প্রজন্মকে রানির বার্তা

নতুন ক্লাবে যোগ দেওয়া প্রসঙ্গে গত আগস্টে বিবিসির ‘উইমেনস ফুটবল উইকলি’ পডকাস্টে পুতেয়াস মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি সব সময় নতুন ও ভালো কিছুর দিকে তাকাতে পছন্দ করেন। খেলোয়াড় ও মানুষ হিসেবে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তিনি লন্ডনে এসেছেন। তবে এবারের ব্যালন ডি’অর মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যা বলেছেন, তা তাঁর সমস্ত ট্রফি ও গোলসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বমঞ্চ থেকে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা দিয়ে বলেন

‘পৃথিবীর সব ছেলে ও মেয়েকে বলছি, তোমরা যদি ফুটবল ভালোবাসো, যদি ফুটবল খেলতে চাও, তাহলে খেলো। তুমি ছেলে না মেয়ে, কিংবা কোথা থেকে এসেছ—তাতে কিছুই যায় আসে না। কেবল নিজের ভালোবাসার ওপর বিশ্বাস রাখো।’ কেউ যদি বলে তুমি পারবে না, তার কথা শুনবে না।

রাস্তায় বল নিয়ে দৌড়ানো মোলেত দেল ভালেসের সেই ছোট্ট মেয়েটির গল্প আজ বিশ্বজুড়ে লাখো তরুণ-তরুণীর প্রেরণার উৎস। যে মেয়ে একদিন ক্যাম্প ন্যুর গ্যালারিতে বসে বড় তারকাদের স্বপ্ন দেখত, নানা চোট ও বাধা টপকে সে নিজেই আজ ফুটবলের অপরাজেয় রানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *