মিরপুরে মাজারের দোকান নিয়ে চলছে কোটি টাকার চাঁদাবাজি
রাজধানীর মিরপুরের হজরত শাহ আলী মাজার শরিফ কাঁচাবাজার আড়ত কমপ্লেক্সে নানা অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। মাজার কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আড়তের ৪৪টি দোকান থেকে নিয়মিত লাখ টাকার বেশি অবৈধ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যা বছরে প্রায় চার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এসব দোকানের বরাদ্দ বাতিল বা কখনো বরাদ্দই দেওয়া হয়নি, অথচ সেখানে চলছে রমরমা ব্যবসা। এমনকি দোকানের বাইরের জায়গা থেকেও ‘ফুট ভাড়া’র নামে টাকা তোলা হচ্ছে।
মাজারের ৫১৬টি দোকানের মধ্যে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৫০৮টি বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি আটটির মধ্যে পাঁচটির কখনো বরাদ্দই দেওয়া হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন কারণে ৩৬টি দোকানের বরাদ্দ বাতিল হয়েছে। বর্তমান অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাগজপত্রে ফাঁকা দেখানো ৪৪টি দোকানের জায়গায় নিয়মিত ব্যবসা চলছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব দোকান অবৈধভাবে দখলে নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছেন। ১ ও ৩ অক্টোবর সরেজমিন দেখা যায়, ফাঁকা হিসেবে দেখানো দোকানগুলোর জায়গায় ব্যবসা চলছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আড়তের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিদের বদল ঘটেছে। আগে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টরা নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রভাব বেড়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে আগের বরাদ্দধারীরাও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা–কর্মীরা।
দোকান ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ৩৯৮ নম্বর দোকানের ব্যবসায়ী মো. পান্না দাবি করেন, তিনি মাজারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী ইয়াসিন আরাফাতের কাছে ভাড়া দেন। ৩১২/১ ও ৩১২/২ নম্বর দোকানে কলার ব্যবসা করা হাফিজুর রহমান জানান, তিনি মো. দেলোয়ার নামের একজনকে প্রতি দোকান বাবদ ৩০ হাজার করে মোট ৬০ হাজার টাকা ভাড়া দেন। তবে ইয়াসিন আরাফাত এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি এর সঙ্গে জড়িত নন, ব্যবসায়ীরা নিজেরাই আগের বরাদ্দধারীদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন। আরও দুই আড়তদার একই অভিযোগ করেছেন। কোথাও একটি দোকান ভাগ করে একাধিক ব্যবসায়ী বসেছেন। কয়েকজন ব্যবসায়ী নিজের দোকানের নম্বরও জানেন না। ৩১২/১ নম্বর দোকানের বরাদ্দধারী মো. বদিউজ্জামানের কাছে মাজারের পাওনা ৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
সাবেক কাউন্সিলর মুজিব সরোয়ারের ১৯৮ নম্বর দোকানটি পাঁচভাগে বিভক্ত করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানে ব্যবসা করা ইমন জানান, তারা প্রতিদিন ৮০০ টাকা করে ভাড়া দিচ্ছেন। এ দোকান ও ২০০ নম্বর দোকানটি দারুস সালাম থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শ্যামল আহমেদ রাসেলের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ রয়েছে। যদিও শ্যামল এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন, এসব ষড়যন্ত্রের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে। তা ছাড়া এ তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা উত্তর সিটির (ডিএনসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মুজিব সরোয়ারের (মাসুম) দুটি এবং সাভারের কাউন্দিয়ার সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান খানের একটি দোকান। কাউন্সিলর নির্বাচন করতে চান বলে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
১৯ নম্বর দোকানের ভাড়া ১ লাখ টাকা দাবি করে ব্যবসায়ী আলফাজ উদ্দিন জানান, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বহিষ্কৃত সদস্য হাফিজুল হাসান ওরফে কানা শুভ্র এ ভাড়া আদায় করেন। তবে হাফিজুল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, ৪৫২ থেকে ৪৫৪ নম্বর দোকানের বরাদ্দ বাতিল হলেও আগের মালিক সোহান সেগুলো দখলে রেখেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তিনি বরাদ্দের বাতিলের কোনো নথি পাননি। অথচ এসব দোকানের ভাড়াটিয়া ফিরোজ আলম তালুকদার দাবি করেছেন, তিনি নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করছেন। আবার ৪৫২, ৪৫৩ ও ৪৫৪ নম্বর দোকানের আগের মালিক মো. সোহান এখনো দোকানগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
মাজার কর্তৃপক্ষ বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছ থেকে এককালীন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা জামানত এবং মাসে নির্দিষ্ট হারে ‘মাটি ভাড়া’ নিয়ে থাকে। কিন্তু বরাদ্দধারীরা নিজেরাই ব্যবসা না করে অধিক লাভে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে দোকান ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে মাজার কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন।

