উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জলপাই হাট: প্রতিদিন লেনদেন অর্ধকোটি টাকা
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলা এখন সরগরম উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ জলপাইয়ের পাইকারি বাজারে। মৌসুমের শুরুতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর এই হাটে প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২০০ টন জলপাই বেচাকেনা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে এই বাজারে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। মৌসুমের শুরুতেই জমে উঠেছে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ এই পাইকারি বাজার।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের পুরো এলাকা জুড়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে জলপাই। আকার অনুযায়ী বাছাই, পরিষ্কার এবং বস্তাবন্দী করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা। দেবীগঞ্জের এই হাটে স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলা থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও তাদের উৎপাদিত ফল নিয়ে আসছেন। ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা ইজিবাইকের মতো যানবাহনে করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জলপাই এখানে পৌঁছায়। কোথাও চলছে ওজন, আবার কোথাও আকার অনুযায়ী বাছাই। এ কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকেরাও অংশ নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিকও রয়েছেন।
দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পূর্ব দেবীডুবা এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবার নিজের গাছের প্রথম জলপাই বিক্রির অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ৫৩ কেজি জলপাই ১৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে তিনি সন্তুষ্ট।
অন্যদিকে সাত-আট বছর ধরে ব্যবসা করা মতিউর রহমানের ভাষ্যমতে, গ্রামে গ্রামে ঘুরে জলপাই সংগ্রহ করে হাটে বিক্রি করে তাদের দল প্রতিদিন মাথাপিছু এক হাজার থেকে বারো শ টাকা আয় করে। স্থানীয় পাইকার মো. বেলাল হোসেন জানান, তিনি প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ টন জলপাই কেনাবেচা করেন, যা প্রাণ কোম্পানি ছাড়াও ঢাকা, বরিশাল ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। পঞ্চগড় থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বলেন, ‘৭ থেকে ৮ বছর ধরে আমরা তিনজন মিলে বিভিন্ন গ্রাম থেকে জলপাই কিনে এই হাটে এনে বিক্রি করি।
এই হাট ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক পাইকারদের অধীনে জলপাই বাছাই, পরিষ্কার ও ট্রাকে লোড করার কাজে নিয়োজিত থাকছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেবীগঞ্জে ৩ হেক্টর জমিতে জলপাই চাষ হলেও আশেপাশের জেলাগুলো থেকে আসা পণ্যের কারণে এটি বিশাল আকার ধারণ করেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাঈম মোর্শেদ জানিয়েছেন, প্রতিবছর অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই বাজারে বেচাকেনা চলে। জলপাইয়ের হাট ঘিরে মৌসুমে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক শ মানুষের। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিক বিভিন্ন পাইকারের হয়ে জলপাই কেনা, বাছাই, পরিষ্কার ও ট্রাকে বোঝাইয়ের কাজ করেন।
তবে এত বড় বাজারের একটি সীমাবদ্ধতা হলো সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। কোনো হিমাগার না থাকায় পচন এড়াতে দ্রুত জলপাই বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠিয়ে দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা হাটের পরিধি বাড়ানো এবং উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরির দাবি জানিয়েছেন। দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত সাহা জানান, হাটের সম্প্রসারণের সুবিধার্থে অচিরেই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাটের পরিধি বাড়ানো ও সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

