প্রবৃদ্ধির ফাঁদ কাটাতে বাংলাদেশে জরুরি কাঠামোগত সংস্কার

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। তবে দেশের অর্থনীতি যে পথে চলছে, তাতে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে—এই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। তিন ফাঁদে গভীর সংকটে অর্থনীতি, পরিত্রাণের পথ কী। কোন ঋণ আদায় করা সম্ভব আর কোনটি আদায় করা কঠিন—তা পরিষ্কার না হলে শুধু নতুন ঋণ দিয়ে সমাধান হবে না। কাজের সুযোগ কম থাকায় আয় বাড়ানোও কঠিন হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর অক্টোবর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

সংস্থাটির প্রক্ষেপণ আরও উদ্বেগজনক; তাদের ধারণা, পরের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে ঠেকতে পারে। যদিও ২০৩০-৩১ অর্থবছরের দিকে এটি ধীরে ধীরে বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও সরকারের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে সরকারের লক্ষ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা। সরকারের লক্ষ্য পূরণ হবে না—এ কথাও এগুলো বলছে না। ব্যবসার সুযোগ থাকলেও নিয়মিত বিদ্যুৎ না পেলে, সহজে ঋণ না পেলে বা নিয়মকানুন বদলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে পিছিয়ে যান। অনেক ঋণ সময়মতো ফেরত আসছে না, আর ব্যাংক পরিচালনায়ও দুর্বলতা আছে। কর ও অন্যান্য আয় কম হলে সেবা, অবকাঠামো এবং দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করার মতো অর্থ সরকারের হাতে কম থাকে।

অর্থনীতির এই মন্থর গতি কেবল প্রবৃদ্ধির হারেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দারিদ্র্যসীমার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয়ের সুযোগ না বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। যদিও প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়া মন্দার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। কম প্রবৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষও টের পাচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের প্রভাবও অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূল সংকট দেশের ভেতরেই। বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব, ব্যবসার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, উচ্চ ঋণের সুদ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এই দুর্বল অবস্থার পেছনে বহির্বিশ্বের ঘটনাও আছে, দেশের সমস্যাও আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচল ও পণ্য সরবরাহে বাধা আমদানি, পরিবহন ও উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা কমলে এবং বিশ্ববাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে কারখানাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিনিয়োগ কমেছে, ব্যবসা চালানোর খরচ ও ঋণের খরচ বেড়েছে, আর নীতির অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। ঋণের চাপে থাকা কিন্তু ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে—এমন কোম্পানিকে ঋণ শোধ ও ব্যবসা পুনরুদ্ধারের জন্য স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা দিতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা অর্থনীতিকে স্থবির করে রেখেছে। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে ব্যাংকগুলো ভালো উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় হতে পারে, যা সরকারি উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাকে সীমিত করছে। ঋণের সুদের ভারে সরকারি বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ জ্বালানির বড় অংশ বিদেশ থেকে কেনে, তাই এসব ধাক্কা এখানে বেশি লাগছে। মন্ত্রণালয়গুলোকে জানাতে হবে, সরকারি টাকায় কী কাজ হলো এবং মানুষ কী সুবিধা পেল। জ্বালানির ঘাটতি, ব্যাংকের দুর্বলতা, কম কর আদায় এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতাও রয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মজুরি দিয়ে আগের মতো কেনাকাটা করা যাচ্ছে না। ব্যাংকের দায়িত্ব হলো আমানতকারীদের টাকা নিরাপদ রাখা এবং ভালো ব্যবসায় ঋণ দেওয়া। ব্যাংক খাত: খেলাপি ঋণের চক্র থেকে কেন মুক্তি মিলছে না।

এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে লোকসান হিসাবভুক্ত করা এবং ঋণ আদায়ের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। করদাতাদের অর্থ দিয়ে কোনো ব্যাংককে বাঁচানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে যে সেখানে স্বচ্ছতা ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা রয়েছে কি না।

দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় সরকারি খরচ কমিয়ে ডিজিটাল নথি ব্যবহারের মাধ্যমে কর আদায় বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পের মান যাচাই ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরানো প্রয়োজন। প্রতিটি প্রকল্পের খরচ, সময়সীমা এবং এর থেকে প্রাপ্ত সুবিধাসমূহ জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। আইএমএফের ঋণের শর্ত হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থেই সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে স্থিতিশীল নীতিমালা ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের বড় দাবি।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *