অংশীদারিত্ব জোরদারে বাংলাদেশ ও জাপানের দুই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি
বাণিজ্য, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্র বন্দর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ খাতে অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার জন্য বাংলাদেশ ও জাপান দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক শেষে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অভ্যর্থনা ও শীর্ষ বৈঠকের সূচি
জাপানের স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। গার্ড অব অনার পরিদর্শন শেষে জাপানের স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন।
ঐতিহাসিক ভিত্তি ও বন্ধুত্বের ইতিহাস
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশি জনগণের হৃদয়ে জাপান একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দুই দেশের এই চমৎকার বন্ধুত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গভীর বিশ্বাস এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, একটি শান্তপ্রিয় জাতি হিসেবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশকে স্বীকৃতিদানকারী অন্যতম প্রথম রাষ্ট্র ছিল জাপান। গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান অন্যতম মূল্যবান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশ এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে।
বৈঠকের প্রাপ্তি ও কৌশলগত অংশীদারত্ব
শীর্ষ বৈঠকের অর্জন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে দুই দেশ এনার্জি, আইসিটি, বাণিজ্য, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্র বন্দর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ খাতে অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন, এই সফরের সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং মূল ক্ষেত্রগুলোতে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে আলোচনার প্রাপ্ত ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ স্তরে উন্নীত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমি জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের অফার করা নানা সুযোগগুলো অন্বেষণ করতে এবং আমাদের প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপের অংশীদার হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”
বাংলাদেশ জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে তিনি জানান, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্যান্য উপকারী ব্যবসায়িক সুযোগ উন্মুক্ত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। আমাদের উচ্চাশা একদম স্পষ্ট—দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সুযোগ এবং অংশীদারিত্বের একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনে রূপান্তর করা, যা আগামী প্রজন্মের জন্য দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চস্তরে উন্নীত করার লক্ষ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের যৌথ ঘোষণা দেন দুই নেতা। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, গত ৫০ বছরে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
জাপানকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার উল্লেখ করে তাকাইচি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জাপান সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্পর্কের এই নতুন মোড় এবং ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ স্তরে উন্নীত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান সহযোগিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে তিনি গভীর আশা প্রকাশ করেন।

