ভোটের দুদিন আগে আদালতে আটকে গেল বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন

নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। নির্ধারিত পাঁচটি ভোটকেন্দ্র, ৩৫ হাজারের বেশি ভোটার এবং দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণা শেষে প্রবাসীরা প্রতীক্ষায় ছিলেন ভোটগ্রহণের। কিন্তু ভোটের মাত্র দুই দিন আগে আদালতের এক আদেশে থমকে গেল এই নির্বাচন প্রক্রিয়া। সাবেক কর্মকর্তা ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান এবং তাঁকে সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ২৩ অক্টোবর শুক্রবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় অবস্থিত কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্ট আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন আয়োজনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে বহুল আলোচিত এ নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মামলাটি কেবল সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান বিরোধের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটির আগের নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ। ২৩ অক্টোবরের তিন পৃষ্ঠার ‘অর্ডার টু শো কজ উইথ টেম্পোরারি রেস্ট্রেইনিং অর্ডার’ পর্যালোচনায় দেখা যায়, কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক চেরি এ বাগস জরুরি বিচারক হিসেবে আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। নির্দেশ অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবরের নির্ধারিত নির্বাচন উপলক্ষে ভোটকেন্দ্র খোলা, ভোটগ্রহণ করা, ভোট গণনা কিংবা নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন বা ঘোষণা করা যাবে না। আগামী ৫ নভেম্বর সকাল ১০টায় কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের পার্ট ২৩, কক্ষ ১৪০-এ পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশ সোসাইটির এবারের নির্বাচনে ৩৫ হাজার ২১৫ জন নিবন্ধিত ভোটারের অংশগ্রহণের কথা ছিল। পাঁচটি ভোটকেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।

আদালতের কঠোর নির্দেশনা

আদালত শুধু ভোটগ্রহণই বন্ধ করেননি, একই সঙ্গে ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানসংক্রান্ত ২৮ আগস্টের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকেও বাংলাদেশ সোসাইটিকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত মামলার নথিপত্র সংরক্ষণের বিষয়েও সুনির্দিষ্ট আদেশ দিয়েছেন। এর আওতায় সংগঠনের মূল ভোটার তালিকা, সদস্যপদের আবেদনপত্র, চাঁদা পরিশোধের হিসাব ও নির্বাচনী ব্যালটসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পরবর্তী আইনি পর্যালোচনায় কোনো কারচুপি না হয়। মামলার আবেদনে ওসমান চৌধুরী অতীতের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড নিয়েও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন।

মামলার পটভূমি ও বাদীর অভিযোগ

মামলার নথি ও প্রকাশিত আবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা ওসমান এ চৌধুরী ২০২৬ সালের নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী ছিলেন। বাদীর দাবি, তিনি নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন ও ২০ ডলার ফি জমা দিয়েছিলেন। আবেদনটি গ্রহণ এবং অর্থ জমার বিষয়টি ২৬১৬০৭ নম্বর রসিদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সোসাইটি কর্তৃক স্বীকারও করা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও গত ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর পাঠানো প্রত্যাখ্যানপত্রে সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলমান মামলা এবং গঠনতন্ত্রের নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারাকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীপক্ষ বাংলাদেশ সোসাইটির গঠনতন্ত্র ও উপবিধির নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারার বৈধতাও চ্যালেঞ্জ করেছে। বাদী আদালতের কাছে ২৮ আগস্টের সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত বাতিল, বিতর্কিত গঠনতান্ত্রিক বিধানকে অকার্যকর ঘোষণা, তাঁকে বৈধ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বা পুনর্বহাল এবং সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা স্বীকৃতির আবেদন জানিয়েছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগে এক রাতে প্রায় ২৭ হাজার কথিত ভুয়া সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ও বাদীপক্ষ উত্থাপন করেছে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালতের নথিতে মামলার নম্বর ৭৩২১৭৪/২০২৬। উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী। সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি ট্রাস্টি বোর্ড ও কার্যনির্বাহী পরিষদের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। দুটি প্যানেলের ৪২ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৪৩ জন প্রার্থী কার্যনির্বাহী পরিষদের ২১টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন।

ওসমান চৌধুরীর অভিযোগ, এর আগে সংগঠনের বিভিন্ন নির্বাচনী অনিয়ম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কারণেই প্রতিহিংসামূলকভাবে তাঁর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বাদীপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান স্থায়ী নয় বলে চিঠিতে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নষ্ট হয়েছে, যা তাঁর ভোটাধিকার ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করেছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী কার্যক্রম

আদালতের এ নির্দেশের পর শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশন। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসেরসহ সংগঠনের শীর্ষ কর্মকর্তারা আদালতের আদেশ, মামলার অভিযোগ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরবর্তী করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক পরবর্তী শুনানির জন্য ৫ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বিবাদীপক্ষ তাদের বক্তব্য ও আইনি যুক্তি উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন। এরপরই আদালত প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। এখন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে, সংশোধিত হবে নাকি প্রত্যাহার করা হবে, তা পুরোপুরি আদালতের পরবর্তী নির্দেশের ওপর নির্ভর করছে। ব্যালটের বদলে এখন আদালতেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনের পরবর্তী ভাগ্য। আট বছর পর আবারও নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে আদালতের এই নিষেধাজ্ঞা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পুরো প্রবাসীদের এখন নজর ৫ নভেম্বরের শুনানির দিকে। বাদীপক্ষের যুক্তি, সংশ্লিষ্ট বিধানটি নিউইয়র্কের প্রচলিত আইন ও জননীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সদস্যদের আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার সীমিত করে। নিউইয়র্কের সিভিল প্র্যাকটিস ল অ্যান্ড রুলসের আর্টিকেল ৭৮ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধানের অধীনে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। আদালত আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে বিবাদীদের কাছে আদেশ ও সংশ্লিষ্ট মামলার নথি নির্ধারিত পদ্ধতিতে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *