পিরোজপুরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শেষ বিদায়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলে চরম নাটকীয়তা ও অনিশ্চয়তা। শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ৮৭ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে ঘিরে দিনভর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছিল। দাফনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। প্রথমে আমরা তাকে দাফনের জন্য নিয়ে আসি। এখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কবর খুঁড়ছি। এ সময় মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়াই রাখতে হয়েছিল। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে দিনভর চলা অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বাধার মুখে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব ঘটে। পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা দাফন নিয়ে ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। দুপুরের দিকে মানিক পশারীর মরদেহ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাওয়ার পর তাদের বিকেলের দিকে অপেক্ষা করতে হয়। জামায়াত নেতারা তাকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে গার্ড অব অনার না দেওয়া এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে পরিবারের দাবি। মানিক পশারীর ছোট বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার অভিযোগ করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাফনের বিষয়ে শুরুতে দায়িত্ব নেওয়া হয়নি, যা তাদের সংকটের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হয়। কিন্তু দাফন করতে না পারায় বিপাকে পড়ি। মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সকাল ১০টায় তার মৃত্যু হয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পরে বিকেল ৫টার দিকে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এর আগে, মরদেহ পুলিশ লাইনসের ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা ছিল। পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, পরিস্থিতির জটিলতা কাটিয়ে রাত দেড়টার দিকে কড়া পুলিশ পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম জানান, মানিক পশারীকে যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়েছে। দিনভর সৃষ্ট নানা জটিলতা শেষে পুলিশ প্রহরায় মরদেহ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। উল্লেখ্য, মানিক পশারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাদী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তিনি একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেও তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। দিনভর নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে রাতের নিস্তব্ধতায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় সম্পন্ন হয়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী নিজ এলাকা ছেড়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। অন্যদিকে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক।

