তামিলনাড়ুর স্কুলছাত্রের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ, শিক্ষকসহ গ্রেপ্তার কয়েক

ভারতের তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুর শহরের পিলামেডু এলাকায় একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বুধবার নিজ বাসভবন থেকে ১৬ বছর বয়সী ওই দলিত শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, স্কুলে গরুর গোশত খাওয়ার বিষয়টি প্রকাশের পর থেকেই সে জাতপাতভিত্তিক বিদ্বেষ ও নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার হচ্ছিল। এই চরম হেনস্তার শিকার হয়েই শিক্ষার্থীর এই পরিণতি হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কোয়েম্বাটুরে নিজ বাড়ি থেকে এক দলিত স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, সম্প্রতি স্কুলে ফেরার আগে কয়েক দিন সে ক্লাসেও যায়নি। শিক্ষার্থীর বাবা কেরালার একটি অবকাশযাপন কেন্দ্রে কাজ করেন।

ঘটনার পর ওই শিক্ষার্থীর মা ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ একটি মামলা দায়ের করেছে। এতে বিদ্যালয়ের শ্রেণিশিক্ষক পি বিজয়কুমারসহ প্রধান শিক্ষক অরুণ কুমার ও দুই সহপাঠীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পুলিশ শ্রেণিশিক্ষক বিজয়কুমারকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রধান শিক্ষকসহ অপর অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তবে ঘটনাস্থলে কোনো সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। বৃত্তির সুবিধা নিতে ওই শিক্ষার্থীও নাম লেখায়।

পরিবারের ভাষ্যমতে, শ্রেণিশিক্ষক বিজয়কুমার তফসিলি জাতিভুক্ত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তালিকা করতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে গরুর গোশত খায় এমন শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রায় দুই মাস আগে শ্রেণিকক্ষে গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে আলোচনার পর থেকে হেনস্তা আরো বেড়ে যায়। ছেলের কাছে স্কুলে গিয়ে অভিযোগ জানানোর কথা ভাবলেও সে আশঙ্কা করেছিল, এতে তাকে আরো একঘরে করা হতে পারে এবং হেনস্তা বাড়তে পারে। পুলিশের ধারণা, পরে সে বাড়িতে ফিরে আসে। দুপুরের দিকে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা তার মা বাড়িতে ফিরে ছেলেকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।

ওই শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন সেই আহ্বানে সাড়া দিলে এরপর থেকেই সহপাঠীদের দ্বারা সে নিয়মিত কটূক্তি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। বিষয়টি প্রধান শিক্ষক ও শ্রেণিশিক্ষকের গোচরে নিলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীর মায়ের ভাষ্য, ছেলেটি বড় হয়ে আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখত, কিন্তু স্কুলের এই বৈষম্যমূলক পরিবেশে সে অসহায় বোধ করছিল। তামিল সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, তার ছেলে আইনজীবী হতে চেয়েছিল।

ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও স্বজনরা পিলামেডু থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এই মৃত্যুকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দলিত অধিকারকর্মী সুরজ কুমার বৌদ্ধ। এদিকে, রাজ্যটির তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতি কমিশন পুরো ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়ে কোয়েম্বাটুরের পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছে।

আম্বেদকরপন্থি ও নারীবাদী অধিকারকর্মী শালিন মারিয়া লরেন্সের মতে, তামিলনাড়ুর গ্রামীণ জনপদে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এভাবে প্রকাশ্যে শনাক্ত করার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষকদের এমন আচরণ দলিত শিশুদের জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের ঝুঁকিতে ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, শিক্ষকের এমন প্রশ্ন করার কারণে শিশুরা এমনভাবে নিগৃহীত হয় যা তাদের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। এই ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও এখন তীব্র প্রশ্ন উঠছে। এ ঘটনায় শিক্ষকের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। দলিত শিশুরা নিজেদের পরিচয় দেয়, এরপর অন্য শিশুরা তাদের এমনভাবে হেনস্তা করে যে তারা মৃত্যুর মুখে পড়ে।

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *