ডায়েট পালনে মিলছে না ফল?
অসংখ্য মানুষ দৈনন্দিন শারীরিক সুস্থতা ও শারীরিক গঠন ঠিক রাখতে ডায়েট অনুসরণ করেন। তবে দেখা যায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পান না। অনেক ক্ষেত্রে ওজন কিছুটা কমলেও খাদ্যতালিকা পরিবর্তনের সাথে সাথে তা পুনরায় বেড়ে যায়। ডায়েট সঠিকভাবে কাজ না করার পেছনে পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতার অভাব, ভুল খাদ্য নির্বাচন ও কিছু সাধারণ অনিয়ম দায়ী। ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় যে নয়টি প্রধান ভুল বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেগুলোর বিশদ বিবরণ নিচে আলোচনা করা হলো ওজন কমলেই ডায়েটকে বিদায় জানানো। ডায়েট করেও কেন কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, আর ওজন কমানোর সুফলই-বা কেন দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তা জানতে জেনে নেওয়া যাক নয়টি সাধারণ ভুল সম্পর্কে।
১. দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার প্রবণতা
খাদ্য গ্রহণ একবারে কমিয়ে দিলে বা দীর্ঘসময় অনাহারে থাকলে দ্রুত ওজন কমবে—এমন ভুল ধারণা অনেকেরই রয়েছে। এর ফলে অনেকে প্রাতরাশ, দুপুরের আহার কিংবা রাতের খাবার সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলেন। এমনকি সারাদিনে মাত্র একবার খাওয়ার অভ্যাসও দেখা যায়। তবে দীর্ঘসময় পেটে খাবার না থাকলে পরবর্তীতে অতিরিক্ত ক্ষুধার তাড়নায় একবারে বেশি খেয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে, যা ওজন কমানোর গতি স্তিমিত করে দেয়। অর্থাৎ, যে পদ্ধতিতে দ্রুত ওজন কমানোর আশা করছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিতে পারে। বেসাল মেটাবলিক রেট (বিএমআর), অর্থাৎ বিশ্রামকালীন অবস্থায় শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণও ব্যক্তিভেদে আলাদা।
২. ক্যালরির মান অনুযায়ী সঠিক খাদ্য নির্বাচনে ভুল
ওজন কমানোর মূল ভিত্তি ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ হলেও অনেকেই পুষ্টিগুণের ভারসাম্য না বুঝে খাবার নির্বাচন করেন। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমাতে গিয়ে প্রধান খাদ্য ভাত পুরোপুরি বাদ দিয়ে তার জায়গায় অতিরিক্ত মুড়ি, নুডলস অথবা ওটস খেয়ে থাকেন। পরিমাণের হিসাব ও পুষ্টিমূল্য সঠিক না হলে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের আসল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। সুস্থ থাকুন, সবল থাকুন, বাস্তবসম্মতভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।
৩. প্রক্রিয়াজাত ও বাইরের খাবারের অতিরিক্ত আসক্তি
সপ্তাহের পাঁচ দিন কঠোর নিয়ম মেনে চলে বাকি দুই দিন ইচ্ছামতো বাইরের খাবার খাওয়া ডায়েটের অন্যতম বড় বাধা। প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ফাস্ট ফুড কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত অতিরিক্ত চর্বি ও লবণযুক্ত ভারী খাবার গ্রহণে অজান্তেই প্রচুর ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে পুরো সপ্তাহের নিয়ম মেনে চলার সুফল নষ্ট হয়। তাই সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
৪. অপ্রয়োজনীয় ও দামি বিদেশি উপকরণের প্রতি ঝোঁক
ডায়েট সফল করতে অ্যাপল সাইডার ভিনেগার, অলিভ অয়েল, ডিটক্স ওয়াটার কিংবা চিয়া সিডের মতো ব্যয়বহুল উপকরণ অপরিহার্য—এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। বাস্তবে সুষম ডায়েটের জন্য এসব বিদেশি খাবারের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। আমাদের হাতের কাছে থাকা দেশীয় ও সহজলভ্য পুষ্টিকর উপাদান দিয়েই সঠিক খাদ্যতালিকা তৈরি করা সম্ভব। আমাদের দেশেই রয়েছে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর নানা খাবার—শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ডাল, ডিম, মাছ ও অন্যান্য প্রোটিনের উৎস।
৫. স্বাস্থ্যকর খাবার ভেবে অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ
যেকোনো পুষ্টিকর খাবারই পরিমাণের বাইরে খেলে তা ক্ষতিকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফল অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর হলেও প্রয়োজনের বেশি খেলে তাতে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা মোট ক্যালরি বাড়িয়ে দেয়। কিছু ফল অতিরিক্ত খেলে পেটে অস্বস্তি বা পেট ফাঁপার সমস্যাও হতে পারে। একইভাবে বাদামে উচ্চমাত্রার ক্যালরি থাকে, যা পরিমিত পরিমাণে না খেলে ওজন কমানোর চেষ্টা ব্যাহত হয়। এ ছাড়া শারীরিক অবস্থা, আগের ব্যাধি ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে প্রোটিন ও পুষ্টির মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
৬. নিয়ম মানার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব
কিছুদিন অত্যন্ত কঠোরভাবে ডায়েট মেনে চলে হঠাৎ তা ছেড়ে দেওয়া এবং আবার নতুন করে শুরু করার ‘অন-অফ’ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল আনে না। অতিরিক্ত বিধিনিষেধ মানতে গিয়ে মানুষ একসময় মানসিক চাপে পড়ে ডায়েট ছেড়ে দেয়। সাময়িক কঠোরতার চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা বেশি কার্যকর।
৭. অন্যের ডায়েট হুবহু অনুকরণ
সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার, বন্ধু বা পরিচিত কারও খাদ্যাভ্যাস না বুঝে নিজের ওপর প্রয়োগ করা অনুচিত। প্রত্যেকের শারীরিক গঠন, বয়সের পার্থক্য, উচ্চতা, দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম এবং পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন। অন্য একজনের জন্য যা কার্যকর, তা অন্য কারও শরীরের জন্য উপযোগী না-ও হতে পারে। তাই নিজের শারীরিক প্রয়োজন বুঝে অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শে খাদ্যতালিকা সাজানো উচিত। তবে পানির প্রয়োজন ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
৮. জীবনযাত্রার অন্যান্য অনুষঙ্গ উপেক্ষা করা
কেবল খাবার কমিয়েই ওজন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা এবং সঠিক মাত্রায় পানি পানের বিকল্প নেই। নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা মেদ ঝরাতে সহায়তা করে। জীবনযাত্রায় সামগ্রিক ইতিবাচক পরিবর্তন না আনলে কেবল আহার নিয়ন্ত্রণ করে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য অর্জন করা যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাধারণত ৭–৯ ঘণ্টা ঘুম উপকারী। • চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি নিয়ন্ত্রণ: মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের অতিরিক্ত গ্রহণ কমিয়ে আনুন। • নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চা। 7, 9, 30, 40.
৯. কাঙ্ক্ষিত ওজন পাওয়ার পরপরই নিয়ম ভেঙে ফেলা
ওজন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর পর অনেকে ধরে নেন যে আর কোনো কড়া নিয়মের প্রয়োজন নেই। ফলে দ্রুত তারা পুরোনো অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যান। এতে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে ঝরে যাওয়া ওজন আবারও ফিরে আসে। মনে রাখা জরুরি, ওজন কমানোর চেয়ে সেই হাসিল করা ওজন ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরও সুষম খাবার ও নিয়মিত শরীরচর্চার ধারা বজায় রাখতে হয়। আসলে ওজন কমানোই একমাত্র লক্ষ্য নয়; কমানো ওজন ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ জীবনযাপনের অতিরিক্ত নিয়মাবলি
শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে ডায়েটের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নিচের নিয়মগুলো যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি
- পর্যাপ্ত ঘুমপ্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
- চিনি ও ক্ষতিকর চর্বি বর্জনঅতিরিক্ত মিষ্টি, চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, ডুবোতেলে ভাজা খাবার, ট্র্যান্স ফ্যাট এবং স্যাচুরেটেড চর্বি জাতীয় খাদ্য পরিহার করা দরকার।
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমনিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় হাঁটা বা ব্যায়াম করা আবশ্যক।
- পর্যাপ্ত পানি পানশরীর সতেজ রাখতে ও বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১৪ গ্লাস পানি পান করা উচিত।
ধৈর্য ও সঠিক মানসিকতার গুরুত্ব
শারীরিক ওজন বৃদ্ধি পেতে যেমন সময় লাগে, তেমনি স্বাস্থ্যকর উপায়ে তা কমাতেও পর্যাপ্ত সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন। অল্প সময়ে ফল না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে নিয়ম ছেড়ে দেওয়া অনুচিত। মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দ্রুত ফল পাওয়ার অবাস্তব প্রত্যাশা না করে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায় এমন সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বেছে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ধৈর্য ও মানসিক স্থিতিই সাফল্যের চাবিকাঠি।

