৬৮তম জন্মদিনে হানিফ সংকেত: আনন্দ নয় বরং কাজের হিসাব
আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, দেশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী উপস্থাপক, নির্মাতা ও লেখক হানিফ সংকেতের ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৫৮ সালের এই দিনে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে জন্মদিন এলেই তিনি খুব একটা উৎসবের আমেজে থাকেন না। উল্টো তাঁর মনে হয়, জীবন থেকে আরও একটি বছর ফুরিয়ে গেল, কিন্তু এখনো কত কাজ বাকি। জন্মদিনের এই দিনে বড় ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে পরিবারের সদস্য, স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানোই তাঁর কাছে অধিক স্বাচ্ছন্দ্যের। তবে জন্মদিন নিয়ে তাঁর ভাবনা অন্য রকম। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাছে সব দিনই সমান, বরং দিনটি এলে আমার একটু খারাপই লাগে। জন্মদিনে বড় আয়োজনের চেয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেই স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর। স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের শুভেচ্ছা, দর্শকের ভালোবাসা আর দোয়া—এসবই তাঁর কাছে বড় পাওয়া। জন্মদিন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা সময়ের কাছেও। এক সাক্ষাৎকারে ফজলে লোহানী সম্পর্কে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন বাংলাদেশের টিভি সাংবাদিকতার জনক। এর পরের গল্পটি বাংলাদেশের টেলিভিশন বিনোদনের ইতিহাসেরই অংশ। হানিফ সংকেত আরও বলেছিলেন, ‘আমি কোয়ান্টিটিতে না, কোয়ালিটিতে বিশ্বাস করি।
হানিফ সংকেতের টেলিভিশন ক্যারিয়ারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল বিশিষ্ট সাংবাদিক ও উপস্থাপক ফজলে লোহানীর হাত ধরে। ফজলে লোহানীর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’-এর মাধ্যমে তিনি টেলিভিশন জগতে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে ফজলে লোহানীর প্রয়াণের পর ‘ঝলক’ নামক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দিয়ে একক উপস্থাপক হিসেবে দর্শকদের সামনে আসেন তিনি। সে সময় থেকেই তিনি নিজের সৃজনশীলতা ও উপস্থাপনার নিজস্ব ঢং তৈরি করতে শুরু করেন। এই বরেণ্য সাংবাদিক ও উপস্থাপকের সান্নিধ্য তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৮৭ সালে এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে দর্শকের সামনে আসেন তিনি। একটি পর্ব শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় পরবর্তী পর্বের প্রস্তুতি।
১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘ইত্যাদি’র যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। হাস্যরস, ব্যঙ্গাত্মক নাট্যাংশ, গান, অভিনয় এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের মিশেলে অনুষ্ঠানটি একটি আলাদা ধারা তৈরি করেছে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দর্শকদের হাসানো, ভাবানো এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অজানা ও গুণী মানুষদের সামনে নিয়ে আসার মাধ্যমে হানিফ সংকেত নিজের এক বিশেষ পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। কখনো নদীর তীরে, কখনো ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে, কখনো প্রাচীন কোনো জনপদে নির্মিত হয় ‘ইত্যাদি’র মঞ্চ।
অনুষ্ঠানটি নির্মাণের পেছনে তাঁর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও একাগ্রতা কাজ করে। যেকোনো জেলায় শুটিংয়ে যাওয়ার আগে ওই স্থানের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন তিনি। তাঁর মতে, নিজেকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি শব্দভান্ডার বাড়ানোর জন্য নিয়মিত বই পড়ার বিকল্প নেই। মিরপুরের ফাগুন অডিও ভিশনের কার্যালয়েও তাঁর এই পড়াশোনার নেশা ও পরিকল্পিত কাজের ছাপ স্পষ্ট। সেখানে ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন বই এবং স্মারক যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি দর্শকের হাতে এখন ইউটিউব, ফেসবুকসহ নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এখানে হাসি আছে, কিন্তু অশ্লীলতার আশ্রয় নেই; ব্যঙ্গ আছে, কিন্তু বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা নেই। প্রতিটি আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ইতিহাস, লোকসংগীত, সংস্কৃতি, দর্শনীয় স্থান ও মানুষের জীবনসংগ্রাম। শব্দভান্ডার বাড়ানোর জন্যও পড়া জরুরি।’।
‘ইত্যাদি’ শুধু একটি বিনোদন অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি পারিবারিক মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। অশ্লীলতামুক্ত হাসি, বিদ্বেষহীন সমালোচনা এবং সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মানবিক কাজের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তিনি নিয়মিত উপস্থাপন করেন। হাওরাঞ্চলের ভাসমান স্কুল কিংবা প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা নিভৃতচারী পলান সরকারের মতো মানুষের গল্পগুলো ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমেই বৃহত্তর দর্শক পরিচিতি পেয়েছে। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ভাসমান স্কুলের শিশুদের যাতায়াত ও শিক্ষার মানোন্নয়নেও অনুষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থাপনা, ছন্দময় কথন, পরিমিত রসবোধ আর সামাজিক দায়বদ্ধতা ‘ইত্যাদি’কে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।
প্রযুক্তির এই যুগে ইউটিউব বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে মনোযোগ ধরে রাখার তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও তিনি মান ধরে রাখার ওপর জোর দেন। হানিফ সংকেতের মতে, সাময়িক শোরগোল বা ভাইরাল হওয়া বড় কথা নয়, বরং দর্শক কী পেলেন এবং সেই কাজ সমাজে কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব ফেলল—সেটাই আসল। প্রযুক্তির উৎকর্ষকে তিনি অস্বীকার করেন না, তবে বিনোদনের আড়ালে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতার এই সময়ে প্রায় চার দশক ধরে একটি অনুষ্ঠানকে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রাখা সহজ নয়।
লেখক হিসেবেও হানিফ সংকেতের পদচারণা বিস্তৃত। ‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’ ও ‘প্রতি ও ইতি’-র মতো তাঁর রম্যরচনার বইগুলো পাঠকমহলে সমাদৃত। এসব বইয়ে তিনি নিজস্ব ভাষা ও ভঙ্গিমায় সমাজের বিভিন্ন অসংগতিকে তুলে ধরেছেন। কখনো একটি বাক্য, কখনো শব্দের খেলা, কখনো ছোট্ট ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেন সমাজের বড় কোনো অসংগতি।
দীর্ঘ কর্মজীবনে পেয়েছেন নানাবিধ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি। ২০১০ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন এবং চলতি বছর তাঁর অর্জনের মুকুটে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’। সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য এই সম্মাননা তাঁকে প্রদান করা হয়। এছাড়া জাতীয় পরিবেশ পদকসহ মেরিল- পুরস্কারে বহুবার সেরা টেলিভিশন অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘ইত্যাদি’।’
পুরস্কারের চেয়ে দর্শকের ভালোবাসাকেই তিনি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন। জন্মদিনের এই দিনেও তিনি পেছনে ফিরে তাকান এবং ভাবেন সামনের দিনগুলোতে আরও কত নতুন এলাকা ঘুরে দেখা যায় এবং প্রান্তিক মানুষের গল্প তুলে আনা যায়। যত দিন দর্শক চাইবেন, তত দিন তিনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান।
হানিফ সংকেতের কাছে ‘ইত্যাদি’ কোনো সাধারণ অনুষ্ঠান নয়, এটি দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতার একটি মেলবন্ধন। কোনো জেলায় অনুষ্ঠান করার পূর্বে তথ্যানুসন্ধানের জন্য প্রতিনিধি পাঠানো এবং নিজে গিয়ে স্থান পরিদর্শন করে পরিকল্পনা সাজানো তাঁর কাজের শৃঙ্খলারই বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিনের এই নিষ্ঠাই তাকে চার দশক ধরে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে রেখেছে। একসঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমার বন্ধু এবং অভিভাবক।’। এই ‘বন্ধু ও অভিভাবক’ পরিচয়ের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা। প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য প্রতিনিধি পাঠান।
জন্মদিন মানে কেবল বয়স বেড়ে যাওয়া নয়, বরং তাঁর কাছে এটি নতুন করে কাজের অনুপ্রেরণা। চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশের নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি যে ভালোবাসা অর্জন করেছেন, তা-ই তাঁর পথচলার মূল শক্তি। জন্মদিন নিয়ে তাঁর আক্ষেপ থাকলেও, কাজের প্রতি তাঁর তৃষ্ণা কখনো কমে না।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পর তিনি জানিয়েছিলেন, পুরস্কার আনন্দের হলেও মানুষের ভালোবাসা এবং দর্শকের আস্থা তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। অনাগত দিনেও তিনি নতুন কোনো সামাজিক বার্তা কিংবা মানবিক গল্পের সন্ধানে এগিয়ে যেতে চান, যা সমাজ পরিবর্তনে সহায়ক হবে।

