ইসরাইলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণ: কী বদলাবে?
আজ মঙ্গলবার ইসরাইলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন, যা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও তার লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে সরকার গঠনের লড়াইয়ে নেমেছেন। তবে এবার তার ডানপন্থি জোটের বিপরীতে বিরোধী শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই নিশ্চিত জয়ের ইঙ্গিত মেলেনি, ফলে ফলাফল নিয়ে রয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখেও রয়েছেন নেতানিয়াহু। সরকারে কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের প্রভাবও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই ইসরাইলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলার পর থেকেই গাজায় সামরিক অভিযান এবং পরবর্তীকালে লেবানন, ইরান, ইয়েমেন, সিরিয়া ও কাতার পর্যন্ত আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সরকারের জবাবদিহিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলি নীতি নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গাজায় এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটছে।
নেতানিয়াহু এবারও লিকুদ পার্টি এবং কট্টর ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় দলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন।
তবে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির পক্ষ থেকে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এ ছাড়া ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলাও বিচারাধীন। যদিও নেতানিয়াহু শুরু থেকেই এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছেন।
নির্বাচনী আলোচনায় উঠে এসেছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে ও পরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়ভার। একই সঙ্গে সরকারে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর অংশগ্রহণ এবং অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু নেতানিয়াহুর টিকে থাকা নয়, এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ইসরাইলের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে।
ইসরাইলের রাজনীতিতে ডানপন্থি আদর্শের প্রভাব কয়েক দশক ধরেই বাড়ছে। ২০১৮ সালে গৃহীত ‘জাতিরাষ্ট্র আইন’ ইসরাইলকে ইহুদি জনগণের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যা ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও বসতি সম্প্রসারণের বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক শাসনামলে এই ডানমুখী প্রবণতা ও বিচার বিভাগ সংস্কার নিয়ে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৩ সালের বড় আকারের বিক্ষোভে। এ নিয়ে ২০২৩ সালে ইসরাইলে বড় ধরনের বিক্ষোভও হয়েছিল। তার বক্তব্য, নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে যারা নিজেদের উপস্থাপন করছেন, তাদের কাউকেই প্রকৃত বামপন্থী বলা কঠিন। ইসরাইলের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমে রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের নেতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য জোটের বিষয়টি প্রায়ই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একে অপরকে আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নেতানিয়াহু পরাজিত হলে ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিবেশে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। আহরন ব্রেগম্যানের মতে, নেতানিয়াহু অত্যন্ত বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব হওয়ায় তার বিদায় রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করতে পারে। তবে এটিই যে দেশটির সামগ্রিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনবে, তা নিশ্চিত নয়। ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলি সমাজ আরও ডানপন্থি হয়ে ওঠায় নতুন সরকার গঠিত হলেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন রয়ে যাবে। লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও ইসরাইল বিষয়ক বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিলে শুরুতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে রাজনৈতিক পরিবেশ ও নেতৃত্বের ধরনে।
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, ইসরাইলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার টিকে থাকা এখন সরাসরি এই নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত। তবে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রশ্নে বড় কোনো পরিবর্তনের আশা দেখছেন না পর্যবেক্ষকরা। মূলধারার বিরোধী নেতারা নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা ব্যর্থতার সমালোচনা করলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক পরিবর্তনের দাবি তাদের প্রচারণায় স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বিরোধীরা মূলত সরকারের দক্ষতা, নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নে তার সমালোচনা করেছেন। গাজায় যুদ্ধের বৈধতা বা ফিলিস্তিনিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় আচরণকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকে সরাসরি গণভোটে পরিণত করার মতো অবস্থান তাদের প্রচারে দেখা যায়নি।
গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ইসরাইলের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, মূলধারার জায়নবাদী দলগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি নিপীড়নের ধরন নিয়ে মতভেদ থাকলেও লক্ষ্য অভিন্ন। বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল লেভির মতে, পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে এই দলগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক ঐকমত্য বিরাজ করছে। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার ভাঙন এবং কয়েক দশকের নিরাপত্তা সংকট দেশটির মধ্যপন্থী ও বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে ক্রমেই দুর্বল করেছে।
ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক হলেও তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে মূলধারার নেতারা নীরব। শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, এটি ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্যেরই একটি বড় প্রতিফলন। তার মতে, ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের সমান রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার কোনো বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, গাজা যুদ্ধ ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদারত্ব এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত ইসরাইল কোন পথে হাঁটবে, তা এখন ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

