ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্লাভিও বোলসোনারোকে হারিয়ে আবার জয়ী লুলা
ব্রাজিলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও জয়ী হয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। রোববারের এই নির্বাচনে তিনি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সেনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোকে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত করে চতুর্থ মেয়াদের জন্য নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। দেশটির অফিসিয়াল নির্বাচন কমিশনের তথ্যে এই ঐতিহাসিক জয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সব হিসাব-নিকাশ ও তিক্ত লড়াই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ডানপন্থি বোলসোনারোকে হারিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন বামপন্থি নেতা লুলা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, রোববারের দ্বিতীয় ধাপের ভোটে লুলা ৫১ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন।
অন্যদিকে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বোলসোনারো অর্জন করেছেন ৪৮ শতাংশের কিছু বেশি ভোট। স্থানীয় সময় রাত ৯টা ১৩ মিনিটে ব্রাজিলের সুপিরিয়র ইলেক্টরাল কোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করে। ভোট গণনার চূড়ান্ত পর্যায়ে ৮০ শতাংশের বেশি ব্যালট গণনার সময় লুলার পক্ষে ৫১ শতাংশ এবং বোলসোনারোর পক্ষে ৪৮.৬৮ শতাংশ সমর্থন পাওয়া যায়।
এই জয় লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশটিতে লুলার ক্ষমতা সুসংহত করেছে। এর মাধ্যমে ডানপন্থি জোটের ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন আপাতত বড় ধাক্কা খেল। তবে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরও পরাজিত প্রার্থী ফ্লাভিও বোলসোনারো কিংবা তার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় স্বীকারের কোনো বার্তাও তার শিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। ফলে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করার যে স্বপ্ন ডানপন্থিরা দেখছিল, তা এবার বড় ধাক্কা খেল। কারণ লুলার নিজস্ব শিবিরের মানুষসহ অনেকেই ভেবেছিলেন ফ্লাভিও বোলসোনারোই হয়তো বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
বোলসোনারোর প্রচার সমন্বয়ক রজেরিও মারিনহো ভোটের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীরব রয়েছেন। উল্লেখ্য যে, ফ্লাভিও বোলসোনারোর বাবা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হলেও কখনোই তা স্বীকার করেননি। বর্তমান নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সেই একই পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফার্নান্দো ব্রাঙ্কোলি আল জাজিরাকে জানান, নির্বাচনের প্রথম ধাপে পিছিয়ে পড়ার পর এভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে আসার ঘটনা ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি আরও বলেন, প্রথম ধাপে ডানপন্থিদের উত্থান দেখে অনেকে লুলার পরাজয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত সব অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে। লুলার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের জয় যতটা আনন্দদায়ক, পরবর্তী পথ চলা ততটাই চ্যালেঞ্জিং। ফার্নান্দো ব্রাঙ্কোলির মতে, লুলার পক্ষে কোনো পরিকল্পনা এককভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। তাকে সরকারের ছোটখাটো লক্ষ্য অর্জনেও বিরোধী পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আপস ও দরকষাকষির পথ বেছে নিতে হবে। ফার্নান্দো ব্রাঙ্কোলির মতে, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই দেখতে পাব যে, লুলার সরকার তাদের সব পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারবে না। ছোট ছোট বিষয়ে জয় পেতে হলে তাকে বিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে আপস ও দরকষাকষি করে এগোতে হবে।’।
ব্রাজিলের আধুনিক ইতিহাসে প্রথম ধাপে হেরে গিয়ে দ্বিতীয় ধাপে জয়ী হওয়ার মতো ঘটনা এবারই প্রথম। এই জয়কে লুলার সমর্থকরা গণতন্ত্রের এক ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখছেন। তবে বিভক্ত জনমতের এই দেশে নতুন মেয়াদে লুলা কীভাবে দেশ পরিচালনা করেন, তা এখন দেখার বিষয়।

